বঙ্গবাসীকে লেখা নরেন্দ্র মোদির (Naredra Modi) খোলা চিঠি পাল্টা মোক্ষম খোঁচা দিল রাজ্যের শাসকদল। মোদির চিঠি পোস্টের একদিন পরে একই ভাবে তাঁর চিঠির আঙ্গিকেই খোলা চিঠি লিখল তৃণমূল (TMC)। আর তার প্রতি ছত্রে বিজেপিকে আক্রমণ করা হয়েছে। এই সেই চিঠি যেটি নরেন্দ্র মোদি আপনাকে কখনওই পাঠাবেন না- লিখে নিজেদের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছে রাজ্যের শাসকদল।

প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো চিঠিতে (Letter) লেখা ছিল, “আর মাত্র কয়েক মাস, তারপরেই নির্ধারিত হবে পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) ভাগ্য। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোন পথে চালিত হবে, তার গুরুদায়িত্ব নির্ভর করছে আপনার একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের উপর। আমার স্বপ্নের সোনার বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা আজ চরম বঞ্চনার শিকার। তাঁদের যন্ত্রণায় আমার হৃদয়ও আজ ভারাক্রান্ত। তাই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমি একটিই সংকল্প গ্রহণ করেছি, পশ্চিমবঙ্গকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করে তোলার সংকল্প।“
আরও খবর: ‘বিচার’ মেলেনি আলিমুদ্দিনে! এবার CPIM ঘনিষ্ঠ আইনজীবীর বিরুদ্ধে থানায় যৌন হেনস্থার অভিযোগ ‘নির্যাতিতা’র

এর পাল্টা পয়েন্ট ধরে ধরে মোদিকে জবাব দিয়েছে তৃণমূলে। ‘বিকশিত ভারত’ থেকে শুরু ‘বঙ্কিমদা’- সব বিষয় নিয়েই কটাক্ষ করেছে বাংলার শাসকদল। মোদির ছবি দেওয়া লেটারপ্যাডে লেখা মোদির বয়ানে চিঠিতে লেখা,
“বাংলার মানুষের কাছে আমার অকপট স্বীকারোক্তি
বহু প্রতীক্ষিত স্বীকারোক্তি দিয়ে আমি শুরু করছি: আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমি বারবার দাবি করেছিলাম যে, বাংলায় দুর্গাপুজো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মিথ্যে বলে প্রমাণিত। এখন আর কোনও পথ না পেয়ে, ‘জয় মা কালী’ বলে ভক্তি প্রদর্শনের অভিনয় করতে হচ্ছে আমাকে। বাংলার সেই সুগভীর সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রশংসা করার ভান আমি করছি, সত্যি বলতে যা আমি কখনই বুঝিনি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই মহান রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। আগামী প্রজন্ম কোন পথে হাঁটবে, তা নির্ভর করছে আপনাদের বিচক্ষণ ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের উপর। তাই আমি বাধ্য হয়েই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে নিজের প্রকৃত রূপ সকলের সামনে তুলে ধরছি।
আমি স্বীকার করছি, বাংলার উন্নয়নের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রাজ্যের প্রাপ্য কেন্দ্রীয় তহবিলের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আটকে দিয়েছি। আমি MGNREGA (যে নামটা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যুক্ত বলে আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর), আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক যোজনা এবং জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পের টাকা দিইনি। চরম নিষ্ঠুরতায় শ্রমিকদের মজুরি, পরিবারগুলির মাথার উপরের ছাদ, গ্রামের রাস্তা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিশ্রুত পানীয় জলের প্রাপ্য কেড়ে নিয়েছি। এগুলি আসলে আমারই পরিকল্পিত বঞ্চনা, যা বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
আমি এও স্বীকার করছি যে আমার নীতিগুলি সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। আমি সেইসব মহিলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, যাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে, সেইসব কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেছি, যাদের ভবিষ্যৎ আমি বিদেশি শক্তির কাছে বন্ধক দিয়েছি, কর্মহীন যুবসমাজ এবং আমার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হওয়া প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছি আমি। কিন্তু বাংলা এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম; আপনাদের ‘স্বনির্ভর বাংলা’ আমার মনে তীব্র ক্ষোভ ও হিংসার জন্ম দেয়। আর কোনও উপায় না পেয়ে, আমি আমার দলের শাসনে চলা রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের নিশানা করছি। বাঙালি ও বাংলাদেশির মধ্যে থাক| পার্থক্যকে সচেতনভাবে মুছে, মাতৃভাষার ভিত্তিতে মানুষের পরিচয় নির্ধারণের ষড়যন্ত্র করে তাঁদের আটক, দেশান্তর ও শারীরিক নির্যাতন করেছি, এমনকী মৃত্যুর পথেও ঠেলে দিয়েছি।
আপনাদের রাজ্য সম্পর্কে এই অবজ্ঞা আসলে আমার চরম অজ্ঞতা থেকে এসেছে। আমি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অত্যন্ত হালকাভাবে ‘বঙ্কিম দা’ বলে সম্বোধন করার মতো ভুল করেছি। আমার দল স্বামী বিবেকানন্দকে ‘অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট’ বলে অপমান করেছে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর করেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গায়ের রং নিয়ে উপহাস করেছে এবং ‘জনগণমন’কে ব্রিটিশদের স্বাগত জানানোর গান বলে বিদ্রুপ করেছে। আমরা স্বাধীনতা দিবসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামাঙ্কিত ট্যাবলো বাতিল করেছি, মা সারদার অবমাননাকর ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়েছি, এমনকী মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছি।
এই সব অপমানেও যখন বাংলার মনোবল ভাঙল না, তখন আমি বাঙালিদের ‘ঘুষপেটিয়া’ বলে দেগে দেওয়ার পথ বেছে নিলাম। আমরা অক্লান্তভাবে এই মিথ্যে প্রচার করেছি যে, আপনাদের রাজ্য অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্য; আসলে পহেলগাম হামলা বা দিল্লির ভয়াবহ বিস্ফোরণের মতো ট্র্যাজেডিগুলি ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিক থেকে নজর ঘোরানোর জন্য এসব করা হয়েছে।
এত কিছুর পরেও আমাদের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণই থাকল। আর তাই আমরা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের চিরাচরিত আচরণ বজায় রেখে নির্বাচন কমিশনকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলাম। বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিতে এবং নির্বাচনের ফলাফল আমাদের পক্ষে আনতে আমরা বাংলার উপর তড়িঘড়ি ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) চাপিয়ে দিলাম। এই প্রক্রিয়ার ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ১৬০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, তা সত্ত্বেও আমি এর কোনও দায়ভার গ্রহণ করিনি ।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিভেদমূলক, বৈষম্যমূলক এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার পরেও আমি আপনাদের কাছে নির্লজ্জের মতো ভোট চাইছি। যদি আপনারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেন, তবে আমার সেই স্লোগান “বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই” মনে রাখবেন। যার মূল অর্থ হল- আপনাদের বেঁচে থাকাটাই আমাদের উপর নির্ভর করছে। আমার অবাধ্য হলে আপনাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে নানা বিধিনিষেধ, যেমন মাছ ও মাংস খাওয়ার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা; ঠিক যেমনটা আমরা আমাদের ‘পাল্টানো দরকার’ প্রচারে আভাস দিয়েছি। এক দশকেরও বেশি সময়ে ‘বিকশিত ভারত’ গড়তে না পারা একজন স্বঘোষিত ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, আমি আপনাদের মাটিতে পা রাখব, ‘বিকশিত বাংলা’-র ফাঁপা বুলি আওড়াব এবং আপনাদের সমর্থনের জন্য ভিক্ষে চাইব।”

এই চিঠির মাধ্যমে বাংলার শাসকদল (TMC) যে ভাষায় মোদি তথা বিজেপিকে (BJP) আক্রমণ করতে চায় সেটাই বুঝিয়ে দিল।

–

–

–

–

–

–


