দোলের আগেই রঙ ও সংস্কৃতির উচ্ছ্বাসে ভাসল বসিরহাট (Basirhat)। বসিরহাট বসন্ত উৎসব (Basirhat Spring Festival) কমিটির উদ্যোগে আগাম বসন্ত উৎসব ও দোল পূর্ণিমা উদযাপিত হল বসিরহাট টাউন হল (Basirhat Town Hall) মাঠে। উৎসবের মঞ্চ জুড়ে ছিল বাউল গান, নৃত্যানুষ্ঠান ও সংগীতানুষ্ঠান। একদিকে যেমন লোকসংস্কৃতির সুরে মাতোয়ারা হন দর্শকরা, তেমনই অন্যদিকে আবির খেলায় মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শিশু ও প্রবীণরাও। রঙিন আবিরে রাঙা মুখ, একে অপরকে আলিঙ্গন, হাসি-আড্ডা আর সেল্ফি তোলার মুহূর্তে গোটা মাঠজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের উচ্ছ্বাস। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য ছিল নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। এই আগাম বসন্ত উৎসবের উদ্যোক্তা ডাঃ শৌর্য্য বন্দোপাধ্যায় । তিনি বলেন, “দোল পূর্ণিমা মানেই শুধু রঙের উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, ভালোবাসা আর একসঙ্গে থাকার বার্তা বহন করে। বর্তমান সময়ে সমাজে বিভাজন ও ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ যেন একদিন হলেও মিলেমিশে আনন্দ করতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই আগাম এই বসন্ত উৎসবের আয়োজন। বসিরহাট শহর বহু সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে সকল শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের মানুষকে এক মঞ্চে আনার চেষ্টা করেছি।” তিনি আরও জানান, এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব ভবিষ্যতেও করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে লোকসংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। আরও পড়ুন: কলকাতা-কল্যাণী সংযোগকারী সড়কপথ উদ্বোধন মুখ্যমন্ত্রীর, SIR আতঙ্কে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের হাতে নিয়োগপত্র

অন্যদিকে, বসিরহাটের এক বাগানবাড়ি শান্তিনিকেতনের বসন্তের ছবি মনে করায়। রঙিন আবির, গানের সুর, হাতের তৈরি শিল্পসামগ্রী আর মানুষের উচ্ছ্বাস। সব মিলিয়ে বসিরহাটের লেডিস ক্লাবের বসন্ত উৎসব কার্যত এক টুকরো সোনাঝুরির হাট হয়ে উঠেছিল। উৎসব জুড়ে ছিল নানান ধরনের কুটির শিল্পের স্টল। কোথাও হাতে তৈরি চকোলেট, কোথাও মাটি ও পাটের অলঙ্কার, আবার কোথাও বাটিক প্রিন্টের পোশাক। প্রতিটি স্টলেই চোখে পড়েছে সৃজনশীলতার ছাপ। শুধুমাত্র কেনাবেচাই নয়, এই শিল্পসামগ্রীগুলো ঘিরে দর্শনার্থীদের কৌতূহল, আলোচনা ও আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। মহিলাদের হাতে তৈরি এই সামগ্রীগুলির মধ্য দিয়ে আত্মনির্ভরতার এক বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

শিল্পসামগ্রীর পাশাপাশি উৎসবের প্রাণ হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। আবির খেলায় মেতেছিলেন অংশগ্রহণকারীরা, চলেছে আবৃত্তি, গান ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মহিলারা পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে এই আয়োজনে যোগ দেন, ভিড় জমে ওঠে বিকেল গড়াতেই। এই বসন্ত উৎসবের উদ্যোক্তা বসিরহাট লেডিস ক্লাব। সংগঠনের তরফে অমৃতা পাঠক জানান, গত আট বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের আয়োজন করে আসছেন তারা। তার কথায়, “আমাদের মূল লক্ষ্য মহিলাদের স্বাবলম্বী করা। তাদের তৈরি সামগ্রী যাতে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, সেই জন্যই এই স্টলের ব্যবস্থা। এতে একদিকে যেমন শিল্পীরা উৎসাহ পান, তেমনই তাদের আয় করার সুযোগও তৈরি হয়।” ভবিষ্যতেও এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

উৎসবে উপস্থিত ছিলেন বসিরহাট পৌরসভার প্রাক্তন পৌরপ্রধান তথা ১৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অদিতি মিত্র রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, “সবার পক্ষে শান্তিনিকেতনে যাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু এখানে এলে অনেকটাই সেই অনুভূতি পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত, শিল্পের আয়োজন আর পুরো পরিবেশটা সোনাঝুরির হাটের কথা মনে করিয়ে দেয়। বসিরহাটের মধ্যে এমন এক আয়োজন সত্যিই অভূতপূর্ব।” সব মিলিয়ে বসিরহাটের এই বসন্ত উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং নারীদের সৃজনশীলতা, আত্মনির্ভরতা ও সমাজের সঙ্গে তাদের সংযোগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

–

–

–

–

–

–



