মহিলা। তাই দেহ সৎকারে তাঁর অধিকার কোথায়? আজও ধর্মীয় অজুহাতে আপনজনের এই গুরুদায়িত্ব নেওয়া থেকে বঞ্চিত রাখা হয় মহিলাদের। সেই নারীর হাতেই যে শেষ মুক্তি পান আজও কত মানুষ, তার হিসাব জানে শুধু দিল্লি। যাঁদের পরিবার মৃত্যুর পরে তাঁদের সঙ্গ ছেড়ে দেয় পরিবার, তাঁর অন্তিম মুক্তির পথ দেখান পূজা।

গত চার বছরে একা হাতে ৬০০০-এর বেশি বেওয়ারিশ লাশ সৎকার (Delhi Social Worker) করে আসছেন দিল্লির এই তরুণী। কোথাও কোনও বেওয়ারিশ লাশ (Unclaimed Bodies) পাওয়া গেলে বা হাসপাতালের মর্গে কোনও অপরিচিত ব্যক্তির দেহ দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকলে নিজের উদ্যোগে সেই দেহ সৎকার করেন এই তরুণী। কে এই তরুণী? কেনই বা অপরিচিতের মৃতদেহ সৎকারের কাজ করেন তিনি?

বছর ছাব্বিশের এই তরুণীর নাম পূজা শর্মা। দিল্লির শাহদরা এলাকার বাসিন্দা পূজারা। ২০২২ সালের ১৩ মার্চ পূজার পরিবারে নেমে আসে দুর্ঘটনার ছায়া। এই দিনপুজার পূজার দাদার সঙ্গে সামান্য ঝামেলা হয়েছিল বেশ কয়েকজনের। যার জেরে পূজার চোখের সামনেই গুলি করে মারা হয় তাঁর দাদাকে। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে কোমায় চলে যান পূজার বাবা। নিজের হাতেই দাদার সৎকার করেছিলেন পূজা। আরও পড়ুন: বলিউডে শোকের ছায়া, প্রয়াত আটের দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মধু মালহোত্রা

দাদার শেষকৃত্যের দিন শ্মশানে দাঁড়িয়ে পূজা এক অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তিনি দেখেন, এই শহরে এমন বহু মানুষ আছেন, যাদের মৃত্যুর পর শেষ বিদায় জানানোর মতো কেউ থাকে না। অজ্ঞাতপরিচয় সেই মৃতদেহগুলো পড়ে থাকে হাসপাতালের মর্গে বা শ্মশানে—নিঃসঙ্গ, অবহেলিত। সেই মুহূর্তেই পূজা একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। যার পাশে কেউ নেই, তাদের শেষযাত্রায় তিনি পাশে দাঁড়াবেন। তারপর থেকেই শুরু হয় তাঁর এক ভিন্ন পথচলা। প্রথম দিকে দিল্লির বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে বেওয়ারিশ মৃতদেহের খোঁজ নিতেন তিনি। পরে সেগুলোর সৎকারের ব্যবস্থা করতেন নিজেই। ধীরে ধীরে তাঁর কাজের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এখন কোনও অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধার হলে অনেক সময় পুলিশ বা সরকারি হাসপাতাল থেকেই পূজাকে খবর দেওয়া হয়।

মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে পূজা শর্মা গত কয়েক বছরে ৬ হাজারেরও বেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহের সৎকার করেছেন। ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয়—কোনো কিছুই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে একটাই বিষয়—একজন মানুষের শেষ বিদায় যেন মর্যাদার সঙ্গে হয়। এই কাজের জন্য তিনি কোনও বড় আর্থিক সহায়তা পান না। পূজার কথায়, তাঁর ঠাকুরদার পেনশনের টাকাতেই বেশিরভাগ খরচ মেটানো হয়। পরিবারের সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজ করে চলেছেন তিনি।

সামাজিক কাজ নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন পূজা। তবে এই পথ বেছে নেওয়ার কারণে ব্যক্তিগত জীবনে নানা বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। সমাজের অনেকেই তাঁর কাজকে ভালো চোখে দেখেন না। অনেকেই দূরত্ব বজায় রাখেন। এমনকি বিয়ের সম্বন্ধও ভেঙে গেছে, কারণ পাত্রপক্ষ জানতে পেরেছিল তিনি মৃতদেহের সৎকারের কাজ করেন। তবু এসব নিয়ে আক্ষেপ নেই তাঁর। পূজার কথায়, এই কাজেই তিনি মানসিক শান্তি পান। মানুষের শেষ বিদায়ে সম্মান দেওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শ্মশানের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন একদিন, সেই প্রতিজ্ঞা আজও অটুট রেখেছেন পূজা শর্মা। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি নীরবে মানবতার এক বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন।

–

–

–

–

