Sunday, March 22, 2026

ভারতের ৪ কোটি ১০ লক্ষ শিশু ওভারওয়েট! চাইল্ড ওবেসিটিতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে

Date:

Share post:

একদিকে গোটা দেশ ডিজিটাল হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভারত গর্বের সঙ্গে বিশ্বকে জানিয়েছে অনলাইন শিক্ষা, ওয়ার্ক ফ্রম হোম (work from home) ব্যবস্থায় এখন বিশ্বের প্রথম শ্রেণির দেশগুলিকে টক্কর দিচ্ছে ভারত। এবার সেই ঘোষণার পাশাপাশি নতুন ‘গর্বের’ কথাও ঘোষণা করতে পারবে ভারত। ভারতীয় শিশুদের শরীরে মেদ বৃদ্ধি গোটা বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে। ভারতের ৪ কোটি ১০ লক্ষ শিশু অতিরিক্ত ওজন ধারণ (overweight) করার সমস্য়ার শিকার। তার মধ্যে ১ কোটি ৪০ লক্ষ শিশুর শৈশবেই অতিরিক্ত মেদের শিকার (obesity)। সমস্য়াটা এমনই যে ২০৪০ সালের মধ্যে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু এই মেদ-সমস্যার (child obesity) শিকার হয়ে যাবে। আর এক্ষেত্রে দেশের তথা আন্তর্জাতিক চিকিৎসকদের দাবি, এর পিছনে একটি শিশুর যতটা দায়, তার থেকে অনেক বেশি দায় একটি পরিবারে, যা বর্তমান আর্থ-সামাজিক কারণে একটি ভুল জীবনযাত্রার (bad lifestyle) শিকার।

ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি দিবসে ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি অ্যাটলাস (World Obesity Atlas) যে পরিসংখ্যান পেশ করেছে সেই অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের ৫ থেকে ১৯ বছরের শিশু কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের রোগে আক্রান্ত ৪ কোটি ১০ লক্ষ শিশু। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৯ বছরের কিশোরদের মধ্যে সংখ্যাটা মারাত্মক বেশি। প্রায় ২ কোটি ৬৪ লক্ষ শিশু ওবেসিটির শিকার। এর মধ্যে ১ কোটি ৪০ লক্ষ শিশু আবার অতিরিক্ত মেদের শিকার। ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যাটা বৃদ্ধির (obesity hike rate) পরিমাণ ৪.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৫ জন ওবেসিটির শিকার।

তবে কিশোর বয়সীদের মধ্যে এই বৃদ্ধির পরিমাণটা মারাত্মক। পরিসংখ্যান বলছে ২০০৫-০৬ সালে এই বয়সীদের মধ্যে ওবেসিটি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়াটা যেখানে ১০০ জনে ১ জন ছিল, ২০২০ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে ১০০ জনে ৪ জন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই ওবেসিটি (child obesity) বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা গত ৫ বছরে সবথেকে বেশি বেড়েছে। মেয়েদের ওবেসিটি শতকরা ১২৫ জন বেড়েছে। এটা শুধু বাড়ার পরিমাণ। তবে মেয়েদের থেকে অনেক খারাপ ছেলেদের হিসাবটা। ছেলেদের ওবেসিটি বৃদ্ধির হার (obesity hike rate) অস্বাভাবিক, ২৮৮ শতাংশ।

বিপদে যে একমাত্র কিশোর বয়সীরা, এমনটা নয়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও বাড়ছে অতিরিক্ত ওজনের রোগ। অতিরিক্ত ওজনের শিশুর সংখ্যা বেড়েছে শতকরা ১২৭ জন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই হারে শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন বাড়া ও ওবেসিটির সমস্যা বাড়লে ২০৩০ সালে ভারতের ২ কোটি ৭০ লক্ষ শিশু এই রোগের শিকার হবে। অর্থাৎ এখনকার দেড় গুণ। আর সেটাই ২০৪০ সালে পাঁচ গুণ বেড়ে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ হয়ে যাবে।

এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য প্রথমত শিশুদের যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা হল উচ্চরক্তচাপ (high blood pressure) জনিত সমস্যা। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক স্কুলে ক্লাস চলাকালীন বা স্কুলের ভিতরে আচমকা শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও এই উচ্চরক্তচাপের সমস্যা উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি শিশু অবস্থা থেকে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়া বা সুগারের (hyperglycemia) সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। আবার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড (triglyceride) বেড়ে যাওয়ার সমস্যা হচ্ছে। ফলে রক্তে মেদ জমে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। যে রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও এখন বিরল নয় শিশু কিশোরদের মধ্যে। এর পাশাপাশি খাদ্য পরিপাক করার ক্ষমতা কমে গিয়ে লিভারের সমস্য়ায় (fatty liver) আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

কিন্তু দ্রুত ভারতীয় শিশুদের এই স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ খুঁজতে গিয়ে সাধারণ জীবন যাপনের সমস্যার বিষয়টিকেই তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা। প্রথমত, শিশুর থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত কিশোররা এখন আর খেলাধূলার দিকে যেতে পারে না। ফলে একদিকে তাদের কায়িক পরিশ্রম করার অভ্যাস কমে গিয়েছে। অন্যদিকে সেই সময়টা তারা কাটাচ্ছে টিভি বা মোবাইল বা গেমিংয়ে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। গবেষণা বলছে দিনে ১ ঘণ্টা টিভি দেখে যে শিশুরা তাদের থেকে যারা ২ ঘণ্টা টিভি দেখে তাদের ওজন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি। কারণ ওই সময়টায় উত্তেজনায় হরমোন ক্ষরণে তাদের খিদেও বেশি পায়।

এর পাশাপাশি যে বড় কারণগুলি গবেষকরা তুলে ধরেছেন তার মধ্যে অন্যতম, জাঙ্ক ফুড খাওয়া। এক্ষেত্রে শিশুদের থেকে বেশি তাদের পরিবারের অভ্যাসের কারণে খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘুম কম হওয়ার কারণেও হরমোন ক্ষরণে (hormonal change) খিদে বাড়ছে শিশুদের। এক্ষেত্রেও পরিবারের বাকি সদস্যদের জীবনযাত্রা প্রভাব ফেলছে শিশু-কিশোরদের উপর। ওয়ার্ক ফ্রম হোম মোডে (work from home) থাকা বাবা-মায়েরা নিজেদের সময়ের হিসাবে খাবার বা ঘুমের সময় নির্ধারণ করছেন। সেখানে শিশুটির সময়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও তাকে সেই পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

এছাড়াও ওজন বা ওবেসিটি বাড়ার (obesity hike rate) একটি বড় কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পড়াশোনা বা এগিয়ে যাওরা মানসিক চাপ। বর্তমান ইঁদুর দৌড়ের বাজারে যেখানে পরিবারের বাকি সদস্যদের জীবন ও জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে হয়, সেখানে তার প্রভাব বাড়ির শিশুদের মধ্যেও পড়ে। এছাড়াও প্রতিটি বিষয়ে শিশুদের প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে দেওয়ায় তাদের হরমোন ক্ষরণ বেড়ে খিদে ও খাবারের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন : কমিশনের অতিরিক্ত কাজের চাপ, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু আরও এক বিএলও-র!

বর্তমানে ভারত যে সমস্য়ার মধ্যে রয়েছে তা এই বিষয়গুলির উপর নজর রেখে দ্রুত কমানোর উদ্যোগ না নিলে ভারতের পরবর্তী প্রজন্ম যখন কর্মক্ষেত্রে যাবেন, তখন হৃদরোগ বা সুগার জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণনাশের সম্ভাবনা বাড়বে। বর্তমান ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যার মধ্যে ৫০ শতাংশ মৃতদের তালিকায় ৫০ বছরের কম বয়সীরা। আর বাকি আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ৪০ বছরের কম বয়সী। গুজরাটের মতো রাজ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পরিমাণ বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। পাশ্চাত্যে যে দ্রুততায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বাড়ছে, তার থেকে ১০ গুণ বাড়ছে শুধু ভারতে। আর এই কম বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার একটা বড় কারণ ওবেসিটি, যা এখন ভারতের শিশুদের মধ্যেই বেড়ে যাচ্ছে। ফলে এনিয়ে যে দ্রুত সতর্কতা কতটা জরুরি, তা এই ধরনের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।

Related articles

রেখা পাত্রকে প্রার্থী মানেন না: জেলা বিজেপির বিক্ষোভ কলকাতায়

টানা তিনদিন ধরে বিক্ষোভ বিজেপির সল্টলেকের দফতরে। এখনও পর্যন্ত ঘোষিত প্রার্থী নিয়ে এতটাই হতাশ বিজেপির আর একটি অংশ...

কলকাতার ক্রীড়াক্ষেত্রে নয়া উদ্য়োগ, জোকায় প্রথম মাল্টি-স্পোর্টস ট্রেনিং সেন্টার

কলকাতা মানেই খেলা পাগল একটা শহর। চিরাচরিত ক্রিকেট-ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে এবার জোকায় গড়ে উঠল রাজ্যের প্রথম মাল্টি-স্পোর্টস ট্রেনিং...

আইপিএল শেষেই বিদায় নেবেন ধোনি? আরসিবির কাছে কোহলির দাবি ঘিরে শোরগোল

অপেক্ষা মাত্র কয়েকদিনের, তারপরই শুরু ক্রিকেট ও বিনোদনের মহা ধামাকা আইপিএল (IPL)। আইপিএলে যে কয়েকজন মহারথীর দিকে বাড়তি...

কমিশনের নির্দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশ: ভাঙড়ে পরিদর্শনে সিপি অজয় নন্দা

নির্বাচন ঘোষণার সময়ই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। নিজেদের প্রতিশ্রুতি রাখতে যথেচ্ছভাবে...