রূপা, লকেট কাজ দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন, বৈশাখী কাজ না করেই ‘অধিকার’ চান?

কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে বাংলার রাজনীতির বৃত্তে ‘হঠাৎ পরিচিতি’ পেয়েছেন বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে শিক্ষক আন্দোলন হোক বা রাজনৈতিক কর্মকান্ড, কোথাও সেভাবে তাঁকে কেউ দেখেনি, রাজনৈতিক পরিচিতি তো দূরের কথা। যদিও বৈশাখী নিজে দাবি করেন রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা, ধ্যানধারণা অনেকের চেয়ে অনেক বেশি। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে তাঁর বন্ধু শোভন সকলেই নাকি মনে করেন তাঁর মত উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য মহিলার জন্য রাজনীতিই সেরা জায়গা। সংবাদমাধ্যমে কথা বলার সময় বৈশাখীদেবী ছদ্ম বিনয়ের আড়ালে প্রায়ই নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি- রুচি নিয়ে অহমিকা প্রকাশ করেন। তাঁর উষ্মা, রাজ্য-রাজনীতিতে অযোগ্যরা জায়গা করে নিলেও শিক্ষিত ও যোগ্যতর হওয়া সত্ত্বেও তিনি সম্মান পাচ্ছেন না! অথচ গত মাসের 14 অগাস্ট দলবদলের আগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে এবং তারপর থেকে এখন বিজেপির বিরুদ্ধে তিনি শুধু অরাজনৈতিক কথা ও বাকিদের বিরুদ্ধে নালিশই করে চলেছেন। শোভন চট্টোপাধ্যায়কে শিখন্ডি খাড়া করে তাঁর নানা শর্ত বিজেপিকে শুধু যে বিড়ম্বনায় ফেলেছে তাই নয়, নানা বক্তব্যের জেরে নতুন দলে তাঁদের বন্ধুর সংখ্যাও দ্রুত কমছে। বিজেপি শোভন-বৈশাখীর অভিযোগকে প্রথমদিকে কিছুটা গুরুত্ব দিলেও এখন কার্যত উপেক্ষার পথে হাঁটছে। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা এঁদের আচরণে ক্ষুব্ধ তাই নয়, বেশিরভাগই এখন চাইছেন এঁরা নিজেরাই বিদায় হোন। শোভনকে যে সাংগঠনিক পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে বিজেপি ব্যবহার করবে ভেবেছিল, দায়িত্ব নিয়ে তা লাটে তুলে দিয়েছেন তাঁর বান্ধবী। ফলে বৈশাখী দলকে ‘ওয়ার্নিং বেল’ দিলেও তাতে পাত্তা দিচ্ছে না বিজেপি। বলা ভাল, নিজেদের কার্যকলাপে এই যুগল রাজনৈতিকভাবে বিজেপির খরচের খাতায় চলে গিয়েছেন। এখন অপ্রত্যাশিত কিছু না হলে বা বৈশাখীর খবরদারি না কমলে বিজেপিতে ‘শোভন-বৈশাখী চ্যাপ্টার’ যে কোনও সময় ‘ক্লোজড’ হতে চলেছে বলাই যায়।

এরপরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা বৈশাখী কেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করতে গিয়ে ধাক্কা খেলেন বা এত দ্রুত একটা দলে বেশিরভাগেরই অসন্তোষের কেন্দ্রে চলে গেলেন? এটা শুধু বিজেপিতেই হল তা বলা যাবে না, অতীতে তৃণমূলও তাঁর সম্পর্কে একই বিরক্তি দেখিয়েছে। কারণটা ঠিক কী? তৃণমূলে অনেকেরই অভিযোগ ছিল যে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বা একাধিক দফতরের মন্ত্রী থাকা শোভনকে ব্যক্তিগত উচ্চাশা পূরণের মই হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন বৈশাখী। ঘটনাচক্রে, বিজেপিতেও একই অভিযোগ উঠছে। দেবশ্রী-ইস্যু তো অনুঘটক মাত্র। শোভনকে সামনে রেখে বৈশাখী দলে তাঁর সমান গুরুত্ব পেতে চান, এই অভিযোগ বিজেপিতে যোগদানের পর সেই বিতর্কিত সম্বর্ধনা-পর্ব থেকেই বারবার সামনে আসছে। 14 অগাস্টের পর থেকে বৈশাখী তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে মিডিয়ায় যত অবান্তর কথা বলেছেন তার এক শতাংশও বলেননি রাজ্য বা দেশ বা আন্তর্জাতিক কোনও সমস্যা নিয়ে। শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যা, বিজেপি কর্মীহত্যা, আইনশৃঙ্খলা, এনআরসি কোনও বিষয়েই তাঁর মতামত শোনা যায়নি। শুধু বস্তা বস্তা অরাজনৈতিক কথা আর কারুর কারুর প্রতি ব্যক্তিগত বিষোদগার ছাড়া। অথচ বিজেপিতে রূপা গাঙ্গুলি বা লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মত মহিলারা যখন সম্পূর্ণ অন্য পেশা থেকে এসেছিলেন তখন তাঁরাও রাজনীতিতে বৈশাখীর মতই নবাগতা ছিলেন। তা সত্ত্বেও নেতৃত্বের নির্দেশ পালন করে, দলীয় শৃঙ্খলা মেনে, জনসংযোগ করে, দলের কর্মীদের সঙ্গে একাত্মতা তৈরি করে, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে নিজগুণে তাঁরা আজ বিজেপিতে জায়গা করে নিয়েছেন, স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন। একজন রাজ্যসভা, আরেকজন লোকসভার সদস্য হয়েছেন। কাজের ক্ষেত্রে কখনও কখনও ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও তা নিয়ে মিডিয়ায় বিতর্কসভা বসাননি। রাজনীতিতে একসময় আনকোরা হয়েও কাজ করতে করতেই যে যার মত পরিচিতি তৈরির চেষ্টা করেছেন। এজন্য তাঁদের কোনও ‘বন্ধু’ ভাঙাতে হয়নি বা কোনও প্রভাবশালীর সঙ্গে সম্পর্কের মই তৈরি করে তার বিজ্ঞাপনও করতে হয়নি। বিজেপিতে রাজ্য বা জেলাস্তরে বহু নেত্রীই আজ কাজ করছেন যাঁরা অন্য পেশা থেকে এসে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছেন। তাহলে বৈশাখীর ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায় হল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মত, সমস্যাটা আসলে মানসিকতার। কাজ করে পদ পাওয়া নয়, আগে পদ দাও তারপর কাজের কথা। অন্য অনেকের চেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি, তার উপর শোভনকে বিজেপিতে নিয়ে গিয়েছেন, এই দম্ভ থেকেই তিনি সম্ভবত কর্মী হওয়ার আগেই নেত্রী হতে চেয়েছেন। কিন্তু এক শোভন ছাড়া তাঁরা নেতৃত্ব মানতে যে আর কেউই রাজি নন, তা শোভন-বান্ধবী বুঝলে তো!