Wednesday, January 14, 2026

রবীন্দ্রনাথ, বিধান রায় আর একটা জন্মাইতে পারে, মনোহর আইচ নয়!

Date:

Share post:

দেবদত্ত বিশ্বাস, হংকং

‘রবীন্দ্রনাথ , বিধান রায় আর একটা জন্মাইতে পারে, কিন্তু মনোহর আইচ আর জন্মাইবো না’ । লোকটা বলেকি ? পাগল নাকি ! রাত তখন সাড়ে দশটা হবে। রাঁচির অশোকা হোটেলের ৩১২ নম্বর ঘরে আমি, নন্দু, চন্দন ( ওঁর সহচর ) , আর তিনি, অর্থাৎ ৮৪ বছরের ( তখন ওঁর বয়স ৮৪ ) বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ। আজই সন্ধ্যায় ওঁর ‘অনারে’ রাঁচি শহরের বিশিষ্ঠদের সমাবেশে চৌধুরী স্যারের ব্যবস্হাপনায় হোটেলের পক্ষ থেকে একটা সংবর্ধনা আর ওঁর দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। নিজের বাজানো বাংলার ঢাকের রেকর্ড করা ক্যাসেট চালিয়ে, লাল ল্যাঙ্গোট পরে , বলে বলে শরীরের প্রতিটা পেশী ঢাকের বাজনার তালে তালে তরঙ্গ তুলে দেখালেন চার ফুট এগারো ইঞ্চির ‘পকেট হারকিউলিস ‘, ৮৪ বছরের তরুন, বিতর্কিত , মেজাজি , ১৯৫২ সালের ‘বিশ্বশ্রী’ মনোহর আইচ।

আমি ভাবছি শরীরের ওপর যার এতো কন্ট্রোল দেখলাম এই সন্ধ্যেবেলায়, মন বা কথার ওপর তার কোনো কন্ট্রোল নেই কেনো এখন এই রাত সাড়েদশটায় ? দিব্যি চিড়ে দ্ই খেতে খেতে বলে চল্লেন – ‘বিধান রায় বড় ডাক্তার আসিলো, আমার বয়সে আইস্যা ও ডাক্তারী করতে পারতো না, আর রবীন্দ্রনাথ , রুগী হইয়া ৮২ বসর বাচ্ছিল, আমার বয়সে আইলে মাথার ঠি ক থাকতো না, আলফাল লিখতো’। সত্যি বলছি এ বক্তব্য বোঝার বয়স , ধৈর্য্য বা ম্যাচিওরিটি তখন আমার ছিলনা। ওটাকে গড়পরতা বাংগালীর বুড়ো বয়সের ভীমরতিই ধরে নিয়েছিলাম। ‘জেঠু , শুয়ে পরুন, অনেক রাত হয়েছে , কাল আবার কলকাতার ট্রেন ধরতে হবে’ বলে পাশ কাটানোর চেষ্ঠা করলাম। ‘ আরে সুভাষ চক্কোত্তি জোর কইরা ……. , বিজেপি থিকা আইলো …….‘ – আরও ঘন্টা খানেক সহ্য করে আমি আর নন্দু নিজের ঘরে ফিরে এলাম।

পরের দিন হাতিয়া এক্সপ্রেস ধরে সারারাত জার্নিকরে হাওড়া ফিরলাম। বাক্স প্যাটরা নিয়ে স্টেশনে নামতেই দেখি শার্প সবুজ রংএর হাতকাটা জামা, আর টুপি পরে চন্দনকে পিছনে রেখে হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের আগে আগে গট গট করে হেঁটে এগিয়ে চলেছেন বিশ্বশ্রী। এতো সত্যজিতের ‘নায়ক’। ‘জেঠু বাই বাই’ বলার দুঃসাহসও হলোনা ঐ থুতনি উচুকরে হাজার মানুষের মধ্যে হেঁটে যাওয়া মানুষটাকে, যিনি নিজের গর্বে অন্তর থেকে গর্বিত, আস্থাশীল। তিনি যেনো বাঙালি, কিন্তু আম বাঙালি নন, ভেতো , কিন্তু ভেতো বাঙালি নন। সত্যিইতো বেঁচে থাকলে যে বয়সে মানুষ অপরের তুলে দেওয়া চামচে ওষুধ খায় , সেখানে তিনি ট্রাপিজিয়াস, ল্যাটিসিমাস আর গ্যাস্ট্রোকনিমিয়াস বলে বলে ঢাকের তালে নাচিয়ে দেখাচ্ছেন, এটাই তো ওঁর ‘গীতাঞ্জলি’।

আজ বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের ১০৮ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে প্রণাম জানাই !

spot_img

Related articles

হাই কোর্টে নিয়ন্ত্রণ শুনানি পর্ব: বুধে ইডি-আইপ্যাক মামলার আগে জারি নির্দেশিকা

একদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। অন্যদিকে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। দুপক্ষের দায়ের করা মামলা কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta...

চন্দ্রকোণায় প্রতিবাদ মিছিল শুভেন্দুর: কাল্পনিক, ভিত্তিহীন অভিযোগ, দাবি তৃণমূলের

আরও একবার বিরোধী দলনেতা নিজের উপর হামলার ঘটনা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় করার চেষ্টায়। নির্বাচনের আগে কোনও ইস্যু...

আক্রান্ত উত্তর ২৪ পরগনায় দুই নার্স! নিপা মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের

রাজ্যে ফের নিপা ভাইরাসের আতঙ্ক। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত দুই নার্সের শরীরে নিপা ভাইরাসের...

রাজনীতির রঙ ভুলে শেষ শ্রদ্ধা সমীর পুততুণ্ডকে: দেহ দান এসএসকেএমে

বাংলার রাজনীতি যে সবসময় সৌজন্য শেখায় তা আবার এক মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেল। মঙ্গলবার প্রয়াত পিডিএস...