উত্তরবঙ্গে ঝটিকা সফরে সিএএ-এনআরসি ধুয়ো তুললেন নাড্ডা

কিশোর সাহা

উত্তরবঙ্গ সফরের প্রথম থেকেই জল্পনা ছিল আদিবাসী, বাঙালি, অবাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে ভোট প্রচারে গিয়ে বিভাজনের রাজনীতির তাস খেলতে পারেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা- রাজনৈতিক মহলের এই জল্পনাই সত্যি করে বাংলায় সিএএ এবং এনআরসি হবে বলে ধুয়ো তুললেন তিনি। সোমবার, শিলিগুড়িতে সেবক রোডের একটি বেসরকারি হোটেলে উত্তরবঙ্গের সব জেলার কার্যকর্তাদের নিয়ে বৈঠকের পরে এ কথা জানান বিজেপি সভাপতি। সিএএ ও এনআরসি নিয়ে উদ্বাস্তু ও শরণার্থী অধ্যুষিত উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিজেপির কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে। সে কথা মাথায় রেখেই হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জোরদার প্রচার চালানোর নির্দেশও দিয়েছেন বিজেপি সভাপতি।

শুধু লোকসভা ভোটের হিসেবের খাতা দেখে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে যে উত্তরবঙ্গের ৫৪টি বিধানসভা আসনে ভালো ফল হবে না- এদিনের ঝটিকা সফরে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি।

দলের সূত্র খবর, বিজেপি সভাপতি জানিয়ে দিয়েছেন, ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে বাজার গরম না করে, কথা কম বলে কাজ বেশি করতে হবে। সেই সঙ্গে দলের ৫৪ বিধানসভা এলাকায় কয়েকডজন নেতা, মন্ত্রী, সাংসদকে ঘিরে যে ক্ষমতার বৃত্ত তৈরি হচ্ছে সে খবরও রয়েছে তাঁর কাছে। তাই বিজেপি সবাপতি সাফ জানিয়ে দেন, কোনও উপদলীয় লড়াই চলবে না। তিনি সাংসদ, বিধায়ক সহ সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের একজোট হয়ে আরও বেশি করে দলের কাজে মনোনিবেশের পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে বিজেপি সভাপতি সংবাদ মাধ্যমের সামনে আলাদাভাবে কিছু বলেননি।

দলীয় বৈঠকের আলোচনার সারমর্ম জানাতে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন সায়ন্তন বসু। তিনি বলেন, “আমাদের সর্বভারতীয় সভাপতি উত্তরবঙ্গের ৫৪টি বিধানসভা আসনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সমস্যার কথা শুনেছেন। সেই মতো পরামর্শ দিয়েছেন। তবে নেতা-কর্মীদেকে তিনি আরও বেশি করে কাজে মনোনিবেশের নির্দেশ দিয়েছেন”। সায়ন্তন জানান, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিন্দু শরণার্থীদের মধ্যে অনেকেরই নাগরিকত্ব নিয়ে যে সমস্যা রয়েছে। তা নাগরিকত্ব আইন প্রয়োগে মিটে যাবে এবং তাঁরা সবাই নাগরিকত্ব পাবেন।

এদিন বেলা ১২টা নাগাদ বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন। সেখান থেকে সোজা যান নৌকাঘাটে। সেখানে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার মূর্তিতে মালা দেন। তারপরে শিলিগুড়ি শহরের আনন্দময়ী কালীবাড়িতে গিয়ে পুজো দিয়ে সেবক রোডের হোটেলে গিয়ে বৈঠক করেন। প্রথমে দলীয় কার্যকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারপরে সমাজের নানা ক্ষেত্রের আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসেন। বিকেলেই দিল্লি ফিরে যান জেপি নাড্ডা।

রাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতির বৈঠক সর্বভারতীয় সভাপতি উত্তরবঙ্গ থেকে কেন শুরু করলেন? দল বলছে, গত লোকসভা ভোটে বিজেপিকে দু-হাত ভরে ভোট দিয়েছে উত্তরবঙ্গ। ৭টি আসন পেয়েছে বিজেপি। ৫৪ আসনের সিংহভাগেই এগিয়ে ছিলপদ্ম শিবির। কিন্তু, সিএএ, এনআরসি নিয়ে লাগাতার প্রচারের জেরে উত্তরবঙ্গেই অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিজেপি। উপরন্তু, পাহাড়ের নেপালি ভাষাভাষীরাও সিএএ, এনআরসি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তা ছাড়াও গোর্খাল্যান্ডের দাবির পক্ষে দার্জিলিঙের সাংসদ খোলাখুলি সওযাল করায় সমতলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাসিন্দারা বিজেপি-বিমুখ হয়ে পড়েছেন বলে দলের মধ্যেই খবর রয়েছে। সেই সঙ্গে দলের উত্তরবঙ্গের নেতাদের একাংশের মধ্যেও অহঙ্কারি মনোভাব দেখা যাচ্ছে বলে দিল্লিতে খবর গিয়েছে। ৫৪ বিধানসভার বেশির ভাগ আসনে দলের অন্তত ৪টি করে উপগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। কোথাও সাংসদের সঙ্গে এলাকার নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আবার বহুদিনের বিজেপি নেতারা রাতারাতি সাংসদ হয়ে মাথায় চড়ে বসা কয়েকজনকে মানতে পারছেন না।

দল সূত্রের খবর, সব দিক মাথায় রেখেই বিজেপি সভাপতি উত্তরবঙ্গ থেকে সফর শুরু করে বার্তা দিয়েছেন। বিজেপির এক নেতা জানান, কলকাতার পর্যবেক্ষকদের একাংশকেও গোষ্ঠীবাজি করতে নিষেধ করেছেন নাড্ডা।

আরও পড়ুন-বিজেপি নেত্রী ইরাবতীকে ‘আইটেম’ বলে সম্মোধন কমলনাথের, বিতর্ক তুঙ্গে