মোশতাকের মৃত্যুতে উত্তাল ঢাকা, সঠিক  তদন্তের দাবিতে সরব বিদেশি কূটনীতিকরা

খায়রুল আলম, ঢাকা

সরকার বিরোধী প্রচারণার দায়ে ডিজিটাল আইনে আটক মুশতাক আহমেদ  বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে তার বড় ভাইয়ের দাবি-মুশতাকের শরীরের ভেতরে বা বাইরে আঘাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি । মুশতাক আহমেদের বড় ভাই ডা. নাফিছুর রহমান  বলেন, ‘আমি নিজে একজন ডাক্তার। মোশতাকের ময়নাতদন্তের সময় আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। তার শরীরের ভেতরে বা বাইরের আঘাতের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে আমি খেয়াল করেছি তা হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকের তুলনায় বড়। এর কারণেও হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকতে পারে। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা কোনো মামলাও করব না।’

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে গত বছর ৫ মে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে র‌্যাব-৩। ৬ মে র‌্যাব মুশতাক ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গ্রেফতার করে। পরদিন ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “মুশতাক ‘আই এম বাংলাদেশি’ পেজের এডিটর। তিনিও গুজব ছড়িয়েছেন। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কার্টুনিস্ট কিশোর তার ‘আমি কিশোর’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনামূলক কার্টুন-পোস্টার পোস্ট করতেন। আর মুশতাক তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কিশোরের সেসব পোস্টের কয়েকটি শেয়ার করেন।
মুশতাক আহমেদ গত বছরের ৪ মে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক হওয়ার পর থেকে জেলে ছিলেন। ছয় দফা আবেদন করেও জামিন পাননি। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে অনেকেই বলেছেন, মুশতাক আহমেদ তার লেখায় সরকারের দুর্নীতির সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করেছিলেন বলেই এ পরিণতি হয়েছে।

মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের দাবিতে শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঘুরে শাহবাগ মোড়ে সমাবেশ করেন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ফ্রন্টসহ কয়েকটি বামপিন্থ ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

অবরুদ্ধ শাহবাগে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। সেখান থেকে আগামী সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন, ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মাসুদ রানা, ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাগিব নাঈম প্রমুখ।

গায়েবানা জানাজা :শাহবাগে মুশতাকের গায়েবানা জানাজা হয় ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগে। এতে ইমামতি করেন ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে শহীদ মিনারে আরেকটি সমাবেশে যোগ দেন তারা।

জানাজা-পূর্ব বিক্ষোভ সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দীন খান, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী, সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর, ছাত্র অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রাশেদ হোসেন, রাষ্ট্রচিন্তার সংগঠক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ ও গণসংহতির সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। আরও অনেকেই মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন।

শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ :সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ ‘জান ও জবানের স্বাধীনতা চাই’র ব্যানারে এ সমাবেশের আয়োজন করেন। এতে বক্তব্য দেন তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, আলোকচিত্রী শহীদুল আলমসহ শাহবাগের সমাবেশের বক্তারা। আনু মুহাম্মদ বলেন, সমালোচনার ভয়ে সরকার কথা বলার অধিকারকে হরণ করতে চায়। মুশতাকের মতো মানুষদের আটকে রেখে, পিটিয়ে হত্যা করে সরকার এবং আদালত একাকার হয়ে গেছে।

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মশাল মিছিলে লাঠিচার্জ :সন্ধ্যায় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মশাল মিছিল জাদুঘরের সামনে এলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জোটের সমন্বয়ক আল কাদেরী জয়। ১২ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন মহানগর পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান।

মুশতাক আহমেদের মৃত্যু রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড :মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলেরও দাবি জানিয়েছে তারা। গতকাল পৃথক সভা-সমাবেশ ও বিবৃতিতে এসব দল ও সংগঠনের নেতারা বলেছেন, মুশতাককে জামিনে মুক্তি না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বিবৃতিতে বলেন, কারাবন্দি লেখকের মৃত্যু একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড।
পৃথক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।
এ ছাড়া বিবৃতি দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) সভাপতি নুরুল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ও সম্পাদক ফয়জুল হাকিম।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হয়। দলের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আবু হাসান টিপুর সভাপতিত্বে এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও করণীয় সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ করেন সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

মুখে কালো কাপড় বেঁধে রাবি শিক্ষকদের প্রতিবাদ :রাবি প্রতিনিধি জানান, লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলকের সামনে তারা মুখে কালো কাপড় বেঁধে মৌন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এ দাবি জানান।
শাবি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ :শাবি প্রতিনিধি জানান, মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এক মানববন্ধনে এই প্রতিবাদ জানান তারা।

নারায়ণগঞ্জে মানববন্ধন :নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল একই প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে গণসংহতি আন্দোলন। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক আল কাদেরী জয়।

১৩ দেশের রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ, তদন্তের আহ্বান: কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) ভুক্ত ১৩ দেশের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত এবং হাই কমিশনাররা এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

শুক্রবার বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী ঢাকাস্থ মিশন প্রধানগণ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আইনি হেফাজতে মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছি। মুশতাক আহমেদ ২০২০ সালের ৫ মে থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) ধারায় বিচারপূর্ব আটক অবস্থায় ছিলেন। আমরা জেনেছি যে, বেশ কয়েকবার তাকে জামিন দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে এবং আটকাধীন অবস্থায় তার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগ আছে।’

যৌথ বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন কানাডার হাইকমিশনার বেনওয়া প্রিফোনটেইন, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইন অ্যাস্ত্রাপ পিটারসেন, ইইউ রাষ্ট্রদূত রেঞ্চে টিয়েরিংক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মারিন স্কু, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াটা, নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভারভেইজ, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত অ্যাসপেন রিক্টার-সেন্ডসেন, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো ডি আসিস বেনিটেজ সালাস, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ড্রা বার্গ ভন লিন্ডে, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি চুয়ার্ড, ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার।