ও মোদিজি, বাংলার যেখানে পা রাখলেন, সেখানেই তো হারলেন ! কণাদ দাশগুপ্তর কলম 

কণাদ দাশগুপ্ত

এ যেন ‘সোনার পা’ !

ভোট প্রচারে বাংলার যে যে কেন্দ্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পা রেখেছেন, সেই সব কেন্দ্র এবং সন্নিহিত কেন্দ্রগুলির ৮০ শতাংশে হেরে ভূত হয়েছে বিজেপি৷ তছনছ হয়েছে দলের সংগঠন ৷ ভাগ্যিস শেষ দফায় ৪-৫ টি সভা বাতিল করেছেন প্রধানমন্ত্রী৷ ওই সভাগুলি তিনি করতে পারলে কমপক্ষে আরও ২০টি আসন কম পেতো বিজেপি৷ বাঁচিয়ে দিয়েছে কমিশন৷ অমিত শাহ বা জে পি নাড্ডার ক্ষেত্রেও এই একই ছবি৷ বিজেপির এই ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ দায়িত্ব নিয়ে নীরবে ‘উপকার’ করে গিয়েছেন তৃণমূলের৷

গোটা প্রচার পর্বে তৃণমূলের অভিযোগ ছিলো, একুশের ভোটে বিজেপির হয়েই খেলতে নেমেছে নির্বাচন কমিশন৷ এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কিছু উদাহরণও তৃণমূল দিয়েছে৷

কিন্তু রাজ্যের শাসক দল ধরতে পারেনি, কমিশনের করোনা- বিধির জেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শেষ ৪-৫টি সভা বাতিল হওয়ায় বিজেপির কতখানি ‘উপকার’ হয়েছে৷ এটাও তো এক রকম গেরুয়া শিবিরের পাশে দাঁড়ানোই হলো৷ এটা না করতে পারলে শূন্য থালা নিয়ে কংগ্রেস বা সিপিএমের পাশের আসনেই হয়তো বসতে হতো বিজেপিকে৷

নীলবাড়ি দখলের লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদির বাংলা সফর শুরু হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। কায়দা করে প্রতি দফার ভোটের দিন কমপক্ষে দু’টি করে সভা করেছেন মোদি৷ প্রথম দফার ভোটের দিন ওপার বাংলায় গিয়ে এপার বাংলার ভোট প্রচার করেন তিনি৷ দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ, প্রতি দফার ভোটগ্রহণের দিনেই ২টি করে সভা করেছেন মোদি৷
সব মিলিয়ে প্রায় ২২টি সভা করেছেন৷ এই ২২ সভা করেছেন শতাধিক দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে৷ মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ‘স্ট্যাণ্ড- আপ কমেডিয়ান’-দের স্টাইলে ‘দিদি…ও দিদি…’ করেছেন৷ ভুলভাল, বিকৃত বাংলা বলেছেন, টেলি-প্রম্পটারের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ‘পদ্মে ছাপ’ বলতে গিয়ে অস্বস্তিকর শব্দও বলে ফেলেছেন৷ তাতেও হাততালি পেয়েছেন৷ চার্জড হয়েছেন৷ আরও গলা ফুলিয়েছেন, আরও বাংলা বলেছেন, আরও লোক হাসিয়েছেন৷ মোদির কপ্টার যতবার বাংলার আকাশে চক্কর কেটেছে, গেরুয়া নেতারা ততই নোটবুকে বাড়িয়েছেন আসনপ্রাপ্তির সংখ্যা ৷ এক সময় তো বলা হচ্ছিলো ২৫০-এর বেশি আসন বিজেপি পেতে পারে৷ বঙ্গ-বিজেপির নেতারা হয়তো শপথ নেওয়ার ড্রেসও বানাতে দিয়ে ফেলেন সেই সময়৷

সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট হচ্ছিলো, বাংলার দখল পেতে বঙ্গ- বিজেপি-র থেকেও বেশি মরিয়া নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিজে এবং শাহ, নাড্ডা, যোগীরা মিলে শ’দেড়েক সভা বা রোড-শো করে বিজেপিকে একের পর এক কেন্দ্রে অপ্রিয় করে গিয়েছেন। আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে ইভিএমে৷ এসব দেখে আজ বিজেপি নেতৃত্ব বিস্মিত হচ্ছেন কেন ?

এটা কি বিজেপি বুঝতে পারছে যে বিজেপির ওই ‘মোদি’-নামক স্বঘোষিত পাশুপাত-অস্ত্রের ধার ও ভার প্রাকৃতিক নিয়মেই যে হ্রাস পাচ্ছে? ‘মোদিজিকে প্রধানমন্ত্রী করার ভোট’ আর ‘মোদিজির কথায় অন্য কাউকে ভোট’ দেওয়া এক নয়৷ কিন্তু বিকল্প বা বদলি কোনও চরিত্রের চরম অভাব থাকায় বার বার এই ‘সব খোল’ চাবিটিই ব্যবহার করতে বাধ্য হয় বিজেপি৷ আর এই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ওই মোদি-অস্ত্র কতখানি ভোঁতা হয়েছে তা ধরা পড়ছে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনগুলিতে৷ বাংলাতেও সেটাই হয়েছে৷ বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ‘Election Mascot’ হিসাবে নরেন্দ্র মোদি দলকে সাফল্য এনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন৷ পরের পর বিভিন্ন রাজ্যের ভোটে ভারতীয় জনতা পার্টি সোজা পথে হেঁটে সাফল্য পাচ্ছে না৷ ভরসা করতে হচ্ছে ‘রিসর্ট- পলিটিক্স’-এর উপর৷ বিজেপির তথাকথিত ‘থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক’ বাহিনী এখনও ধরতেই পারছে না সমস্যাটা আসলে নরেন্দ্র মোদিই৷
ওই মোদি-ফরমুলা কাজে লাগাতে গিয়ে একাধিক রাজ্য থেকে পদ্ম-পতাকা গুটিয়ে ফেলতে হচ্ছে৷ বাংলাতেও তো এবার সেটাই হয়েছে৷ এটা বুঝেও বুঝছে না বিজেপি৷ বিজেপির এসব ভাবতে বসা উচিত ছিলো অনেক আগেই৷ অথচ ভাবার কোনও তাগিদই অনুভব করেনি৷ একবগ্গা হয়ে পুরনো পথেই নরেন্দ্র মোদিকে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ বানিয়ে বাংলার ভোটে নেমে এ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হলো৷ বাংলার মাটিতে আরও একবার স্পষ্ট হলো, মোদিকে ‘সুপার হিউম্যান’ বানানোর খেসারত কীভাবে দিলো বিজেপি ৷

প্রমান মিলছে, অতিরিক্ত ‘মোদি-নির্ভরতা’-ই দলকে ডোবাচ্ছে৷

Advt