Wednesday, June 24, 2026

ধর্মের বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে ব্যতিক্রমী: মহারাষ্ট্রের সৌন্ডালা

Date:

Share post:

মনে আছে তো ক্রান্তিবীর সিনেমাতে নানা পাটেকরের সেই বিখ্যাত ডায়লগ, ‘বলো কোনটি হিন্দুর রক্ত ​​আর কোনটি মুসলিমের’? বর্তমান সমাজে যখন হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ প্রতিদিন বাড়ছে সেখানে এক অন্যরকম উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারতের এই গ্রাম। মহারাষ্ট্রের (Maharastra) আহিল্যানগর জেলার ছোট্ট গ্রাম সৌন্ডালা (Soundala Village)। সারা দেশের প্রচারের আলোতে সরিয়ে রাখার খুব চেষ্টা চলছে। তবুও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই গ্রাম। এই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির বাজারেও যে জাতি, ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র নাগরিক হয়ে বাঁচা যায়, বাঁচতে পারে একটা গোটা গ্রাম – তারই নজির রাখছে সৌন্ডালা।

স্বাধীনতা, সাম্যবাদ আর সৌভ্রাতৃত্ব। এসব যখন শুধুই সংবিধানের বইতে আটকে রাখা একটি কল্পনার জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে সৌন্ডালা। ২৮ হাজার গ্রামের বাসিন্দারা এই শপথই নিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস ভারতের সংবিধান ভারতীয় নাগরিকদের এই তিনটি অধিকার দিয়েছে। তাই তাঁরা গ্রামে সেটাই প্রতিষ্ঠা করবেন। এই গ্রামে জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ থাকবে না। সকলের জন্য মন্ত্র হবে একটিই – আমার জাতি হল মনুষ্যত্ব। আরও পড়ুন: ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই আমাদের শক্তি’, সম্প্রীতি রক্ষার অঙ্গীকার মমতার

কিন্তু কীভাবে এই সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের অধিকার রক্ষিত হবে? কার্যত অসম্ভব এক পরিকল্পনা নেওয়া ও তা রক্ষা করা কী আদতে সম্ভব? গ্রামবাসীদের দাবি সম্ভব। সরকারি দফতর বা স্কুল কলেজ, জন সাধারণের জায়গায় সকলের সমান অধিকার রক্ষা সম্ভব। কিন্তু সৌন্ডালার বাসিন্দাদের দাবি, পানীয় জলের জায়গা থেকে মন্দির-মসজিদ থেকে অন্ত্যেষ্টির জায়গাতেও সমানাধিকার বজায় থাকবে। যেখানে দেশের পূর্বপ্রান্তের একটি রাজ্যে দলিত সম্প্রদায়ের মহিলার হাতের রান্না খাওয়া থেকে ‘বাঁচতে’ স্কুলে ছেলেমেয়েদের পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে সৌন্ডালা সকলের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করছে।

তবে মানসিকতার এই পরিবর্তন আচমকা আসেনি এই গ্রামে। দীর্ঘ লড়াই রয়েছে এর পিছনে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালোভাবে বাঁচা, মানুষকে মানুষের সম্মান দিয়ে বাঁচতে শেখানোর মধ্যে দিয়েই আজ এত বড় সিদ্ধান্তে তাঁরা আসতে পেরেছেন। এক সময় গ্রামসভায় সিদ্ধান্ত হয়, কোনও ব্যক্তি যদি মহিলাদের নিয়ে কুরুচিকর বা অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন, তবে তাঁকে ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। ইতিমধ্যেই একাধিক ক্ষেত্রে এই জরিমানা ধার্য হয়েছে। এই গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, ভাষার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানসিকতা; তাই প্রথম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শব্দচয়নে।

পণপ্রথা ও গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থান নিয়েছে গ্রাম প্রশাসন। বিয়ে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে পণ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সামাজিক ও আর্থিক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, গ্রামকে সুস্থ সামাজিক পরিসর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নারীর মর্যাদা ও সমতা নিশ্চিত করতেই হবে। গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ। উৎসব-পার্বণে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানেও বিভাজনের রেখা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে।

ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকদল বিজেপি রাজনীতি করতে গিয়ে যেভাবে মানুষের মনে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ ছড়াচ্ছে। সেখানে বিজেপি শাসিত রাজ্যেরই একটি ছোট্ট গ্রাম মানবতার পাঠ শেখাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের গ্রামাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে যেখানে জাতপাত ও লিঙ্গবৈষম্য এখনও কঠিন বাস্তবতা, সেখানে সৌন্ডালার এই উদ্যোগ অনেকের কাছেই এক সাহসী সামাজিক পরীক্ষার মতো। প্রশ্ন উঠতেই পারেএমন সিদ্ধান্ত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে? তবে আপাতত এই গ্রাম প্রমাণ করেছে, পরিবর্তনের সূচনা করতে বড় শহর নয়, প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সামাজিক ঐক্যমত।

 

 

Related articles

মিড ডে মিলের দায়িত্ব কেন বেসরকারি ধর্মীয় সংস্থাকে? শিক্ষাতেও কি গৈরিকীকরণ?

স্কুলছুট কমাতে ও পড়ুয়াদের পাতে পুষ্টি জোগাতে মিড ডে মিল (Mid-day Meal) চালু করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee)...

দুধিয়ায় বেইলি ব্রিজ নির্মাণ শুরু, স্বাভাবিক হচ্ছে শিলিগুড়ি-মিরিক যোগাযোগ

গত সপ্তাহের প্রবল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিলিগুড়ি-মিরিক (Siliguri-Mirik) সড়ক যোগাযোগ ফের স্বাভাবিক করার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার...

মহরমের মিছিলে বাজবে না ডিজে, অস্ত্র প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা লালবাজারের!

শুক্রবার মহরমের (Muharram) মিছিলে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা জারি করল কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে, অপ্রীতিকর ঘটনা...

স্মার্ট প্রিপেইড মিটার লাগানোর নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি, আন্দোলনে গ্রাহকরা

সরকারি কর্মী ও সরকারি অর্থভোগীদের বাড়িতে প্রিপেইড স্মার্ট মিটার(Smart Meter) লাগানো বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার।...