কিশোর মনের রহস্য গল্প বুননে ফের অনবদ্য পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। চেনা স্টাইলে ইতিহাস- পুরাণ মিলেমিশে একাকার হলেও চিত্রনাট্যের মোড়কে ধাঁধার মায়াজাল দর্শকের অপেক্ষা ধরে রাখতে সার্থক। ভরা গ্রীষ্মের মরশুমে বড়পর্দায় মুক্তি পেয়েছে আবির চট্টোপাধ্যায় (Abir Chatterjee), অর্জুন চক্রবর্তী (Arjun Chakraborty), ইশা সাহা (Isha Saha) অভিনীত ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’। সিনেমার নামেই ঠিক যতটা মনসামঙ্গল মনে উঁকি দেয়, ততটাই জড়িয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক সুবর্ণ সেনের সুন্দরবন অভিযানে। সোনাদা যে গুপ্তধন খুঁজে পাবেন সেটা ভীষণ কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু কীভাবে পাবেন সে উত্তরের অপেক্ষায় সিনেমা হলে বসে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট বেশ উপভোগ্য।

ধাঁধায় মিশেছে রহস্য, তাই গল্পের বিস্তৃত বিবরণ চাক্ষুষ করার উপলব্ধি কলমে ফুটিয়ে তোলা অনাবশ্যকীয়। কিন্তু বাংলার বুকে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস আর পুরাণের মেলবন্ধনে যে কত অজানা তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ার চাকচিক্যে হারিয়ে ফেলছে শিশু-কিশোর মন, সেটা এই সিনেমা না দেখলে অনুভব করা যাবেনা। গল্পের চলন, গুপ্তধনের সন্ধান আর চমক প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধে যথাযথ। এ ছবি একশো শতাংশ পারিবারিক আর অবশ্যই ছোটদের নিয়ে দেখার মতো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কর্পোরেট যুগে সিনেমা শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের কাছে কিছুটা হলেও ক্লাইম্যাক্স অনুমেয় হয়ে উঠতে পারে বটে, কিন্তু বোদ্ধা মনকে একটু বিশ্রাম দিয়ে সুন্দরী সুন্দরবনের নৈসর্গিক দৃশ্যপটে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি অস্বীকার করা যায় না। সৌমিক হালদারের ক্যামেরার সৃজনের জন্য এই সিনেমাকে আলাদা করে নম্বর দিতেই হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুবর্ণ সেন রূপে আবির চট্টোপাধ্যায় যথেষ্ট পরিণত অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন। আবিরলাল (অর্জুন চক্রবর্তী) এবং তাঁর প্রেমিকা তথা হবু বউ ঝিনুক (ইশা সাহা) স্বভাবসিদ্ধ ভাবে যোগ্য সঙ্গত করে গেছেন। এই ছবিতে দুজন মানুষের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। একজন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, এবং অপরজন রজতাভ দত্ত। দ্বিতীয়জন সোনাদার চেনা শত্রু আর প্রথম জন অচেনা বন্ধু। সিনেমার প্রায় শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দুজনেই উপস্থিত, তাই যাঁরা আগের গল্প দেখেছেন তাঁরা একটা চমক আশা করতেই পারেন। নিশ্চিন্তে থাকুন, পরিচালক নিরাশ করবেন না।


এ ছবির অন্যতম সম্পদ তাঁর জটিল ধাঁধা যা বৃদ্ধ মনকেও কৈশোরে ফিরে যেতে বাধ্য করবে। অযথা VFX-এর বাড়াবাড়ি নেই। ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ অন্বেষণকে অনবদ্য করে তুলতে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সুর ভাবনার প্রশংসা না করলে ভীষণ বড় অন্যায় হবে। দশানন ভিলেনের কামব্যাক হোক বা তাঁর টিপিকাল হাসি, প্রতাপাদিত্যের সম্পদ খুঁজতে রজতাভর উপস্থিতিতে সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধ দারুণ উপভোগ্য। অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মুহূর্তে মুহূর্তে মুখভঙ্গির পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয়, কেন তিনি অনায়াসে ছবির মেরুদন্ড হয়ে উঠতে পারেন। আর বাকি যা যা আপনি দেখে অভ্যস্ত, যেমন আবিরলালের পেটুক স্বভাব, আধুনিক মোড়কে থাকা ঝিনুকের স্পেশাল ইনপুট আর সোনাদার ট্রেজার হান্টের সিগনেচার স্টাইল – এই সব কিছুই ভরপুর আমেজে অনুভব আর উপভোগ দুটোই করবেন দর্শক। চারপাশের অস্থির সময় কিংবা দোলাচলে থাকা ভাবনাদের সিনেমা হলের বাইরে রেখে সোয়া দু’ঘণ্টার নির্ভেজাল বিনোদনে নিঃসন্দেহে জমজমাট ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’।

–

–

–

–

–
