Saturday, May 23, 2026

ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার এখন ফ্লিপকার্ট কর্মী! কাঁধে করে ভারী পণ্য ডেলিভারি করছে বহুতলে

Date:

Share post:

করোনা আবহের মধ্যে চলে এসেছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। আমরা মা দুর্গাকে নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখে থাকি। এই বাংলার নারীদের প্রতিভা-দক্ষতা-শক্তি প্রশ্নাতীত। মহিমাও সেই নারী শক্তির প্রতীক। কে এই মহিমা? কী তাঁর মহিমা?

“ফ্লিপকার্ট ডেলিভারি গার্ল”। কথাটা শুনে কিছুটা খটকা লাগে নিশ্চয়। বিশেষ করে এই বাংলায়। বলা ভাল রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারে। কারণ, এই পেশায় সাধারণত ছেলেদের দেখা মেলে।

ফ্লিপকার্ট নামক এই অনলাইন বিপণন সংস্থার দুটি অংশ। প্রথমটি, মোবাইল, টি-শার্ট ইত্যাদি হালকা পণ্য ডেলিভারির জন্য। যেখানে বাইক-স্কুটি বা সাইকেলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেলিভারি করেন এই বিপণন সংস্থার কর্মীরা। এবং তাঁদের সিংহভাগই পুরুষ। তবে মহিলারাও এই কাজ করে থাকেন।

এবার আসা যাক, ডেলিভারির দ্বিতীয় অংশে। এটি মূলত ভারী পণ্যের জন্য। ছোট ম্যাটাডোর বা চলিত কথায় “ছোটহাতি” পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতার বাড়িতে। তারপর সংস্থার ভারী জিনিস টিভি-ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি গাড়ি চালকের সঙ্গে সংস্থার কর্মী ডেলিভারি দেন ক্রেতার বাড়িতে। আর এই অংশে সাধারণত কাজ করেন ছেলেরা। কারণ, ভারী ভারী পণ্য কখনও দোতালায় কখনো তিনতলায় আবার কখনও আরও উপরে পৌঁছে দিতে হয়। আর পৌঁছে দিতে হয়, যিনি ডেলিভারি করেন তাঁকেই।

আর এখানেই সকলের থেকে আলাদা মহিমা খাতুন। হাওড়ার দানেশ শেখ লেনেরএই যুবতী ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্টের ভারী পণ্য ডেলিভারি সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি অনলাইন পণ্য ডেলিভারি গার্ল নয়, তিনি সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল, বাঙালির সেই প্রিয় খেলার প্রিয় খেলোয়াড়।

বছর চব্বিশের মহিমা কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও শতাব্দী-প্রাচীন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মহিলা দলের দক্ষ গোলকিপার। কিন্তু করোনা মোকাবিলায় দীর্ঘ লকডাউন পর্বে খেলাধুলা একেবারেই বন্ধ। বন্ধ প্র্যাকটিস কিংবা টুর্নামেন্ট। ফলে বিষয়টা কিছুটা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার মতই। যদিও হাল ছাড়ছেন না মহিমা।

ফুটবলই একমাত্র নেশা। ফুটবলই ভালোবাসা। ফুটবলই প্যাশন। কিন্তু সেই ফুটবলই নেই এখন তাঁর পায়ে। নেশাখোর পেশা করতে চেয়েছিল সে। পেশাদার মহিলা ফুটবল কিছুটা হলেও উপার্জনের মুখ দেখে ছিল মহিমা। কিন্তু করোনা মহামারীর সৌজন্যে সেটাও এখন বন্ধ। অন্যদিকে, সংসারে আর্থিক অনটন। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের পেনশনই সংসার চালানোর একমাত্র সম্বল। তাই মহিমা বসে না থেকে পরিবারকে কিছু সাহায্য করার জন্য এই কঠিন আর্থিক পরিস্থিতিতে কাজে নেমে পড়েছে।

মহিমা বলছেন, ফ্লিপকার্টে প্রথমে তাঁকে ইনহাউস জব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে নিজে থেকেই ডেলিভারি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে সংস্থার আধিকারিকদের কাছে। কারণ সে মাঠের মেয়ে। খেলাধুলায় তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তাই ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখতে চায়নি মহিমা। তাঁর বিপুল আগ্রহ ও আবেদনের জন্য শেষ পর্যন্ত রাজি হয় ফ্লিপকার্ট কর্তৃপক্ষ। ভারী প্রডাক্টকে ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করে মহিমা।

গোটা দেশে তাঁর মতো এই কাজ আর কেউ করে কিনা জানা নেই। একটা ম্যাটাডোর বা ছোট হাতিতে টিভি-ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিনের মতো ভারী পণ্য ডেলিভারি করতে থাকে সে। এত পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। শুধু তাই নয়, সেগুলির নিজে হাতে ক্রেতাদের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় মহিমা।

আরও পড়ুন- নির্বাচনের মূল পর্বের আগেই ১ কোটি ভোট পড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে

কিন্তু কেন? আরও তো অনেক কাজ ছিল! এই পোশাকেই কেন বেছে নেওয়া?অকপটে মহিমা জানালেন, “সমাজে পুরুষ-মহিলা বলে আলাদা কিছু নেই। ছেলেরা পারলে মেয়েরা পারবে না কেন। দীর্ঘদিন আমি ফুটবল খেলা ও প্র্যাকটিসের বাইরে। শরীর ফিট রাখতে জিম করতে পারছি না। তাই ঠিক করলাম ভারী ভারী জিনিস ক্রেতাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নিজের ফিটনেসটা বজায় রাখব। কষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু এই কাজটা উপভোগ করছি। আমি একজন ফুটবলার। আমার শারীরিক দক্ষতা অন্যদের তুলনায় কিছুটা হলেও বেশি। তাহলে কেন পারব না? কোনও কাজই ছোট নয়। আর আমি চোট লাগার ভয় পাইনা। জীবনে অনেক চোট পেয়েছি। এটা তো কিছুই নয়।”

মহিমারা ৬ বোন। বাবা রাজ্য সরকারি কর্মচারী ছিলেন। মহিমার কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার মাঝেই মারা যান তাঁর বাবা। ফলে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে ওঠা হয়নি মহিমার। তবে পড়াশোনা শেষ হবে না। যেভাবেই হোক সে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। সঙ্গে চলবে ফুটবলও। কারণ ফুটবলে তার জীবন। ফুটবল ছাড়া তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাইতো জীবনের প্রতিটা পদে ফুটবলকেই সঙ্গী করেছে মহিমা। সেটা তার প্রিয় স্কুটির সাজ দেখলেই বোঝা যায়।

আরও পড়ুন- ভয়াবহ: মৃতদেহ রাখার বাক্সে অসুস্থ বৃদ্ধকে ঢুকিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা পরিজনের

এখন এক দিদি আর মাকে নিয়ে তাঁর সংসার। অভাবের সংসারে কিছু সাহায্য করাই মহিমার উদ্দেশ্য। তাই এমন কাজ বেছে নেওয়া। বাড়িতে কেউ আপত্তি করেনি। বরং, মেয়ের এমন পদক্ষেপে গর্বিত মা। এমনও দিন গেছে মহিমা ২৫টা পর্যন্ত ভারী পণ্য ক্রেতার বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। তবুও মহিমা কিন্তু ক্লান্তিকে ধরা দেয়নি।

তবে মহিমার পরিবারে সে প্রথম খেলোয়াড় নয়। তাঁর আরেজ দিদি বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। সেখান থেকেই প্রথম খেলার প্রতি আগ্রহ। ফুটবলে হাতেখড়ি। সাইতে প্রশিক্ষণ নেওয়া। এরপর স্কুল-ক্লাব-জেলা-রাজ্য-ভিনরাজ্যের বিভিন্ন ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা। বর্তমানে ইস্টবেঙ্গল মহিলাদলের চুক্তিবদ্ধ ফুটবলার সে।

ফুটবলে মহিমার আইকন কে? স্পেনের কিংবদন্তি গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াসের ভক্ত মহিমা।

মহিমা আশাবাদী খুব দ্রুত আবার প্র্যাকটিস শুরু হবে। আবার সে ফুটবল পায়ে মাঠে নামবে। তবে মহিমার অভিমানও আছে। ভারতীয় ফুটবলে এখন বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা বিনিয়োগ করছে। কিন্তু নজর শুধুমাত্র পুরুষ দলগুলোর দিকেই। মহিলারাও ফুটবলে কিছু করে দেখাতে পারে। সেদিকে ফুটবল প্রশাসকদের নজর দেওয়া উচিত বলেই মনে করেন মহিমা। আগের চেয়ে মহিলাদের ফুটবলে এখন কিছুটা নজর দেওয়া হলেও তা যথেষ্ট নয়। মহিলাদের জন্য আরও বেশি একাডেমি- আবাসিক ক্যাম্প করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মহিমা।

তাঁর কথায়, এই বাংলায়-এই দেশে মেয়েদের খেলাধুলায় অনেক প্রতিভা আছে। সেই সুপ্ত প্রতিভাগুলি বেরিয়ে আসুক। ক্রীড়া প্রশাসকরা সেদিকে নজর দিক। তাহলে আরও অনেক মহিমা ভারতীয় ফুটবল ও ক্রীড়া জগতে তাঁদের ফুটবল শৈলীর মহিমা দেখাতে পারবে। তখন “চক দে ইন্ডিয়া” শুধু সেলুলয়েডের পর্দায় নয়, বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে রূপকথার গল্প লিখবে!

আরও পড়ুন- ডানা ছেঁটে, যৌথ দায়িত্ব দিয়ে দিলীপকে কার্যত ‘সবক’ শেখাল দলীয় নেতৃত্ব

Related articles

ইমপার বৈঠকে চূড়ান্ত অসভ্যতা! পিয়াকে হেনস্থা, আস্থা ভোটে সভাপতি বদলের ইঙ্গিত

বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার রদবদলের পরই টালিগঞ্জ পাড়ায় রদবদলের ইঙ্গিত মিলেছে। এবার কার্যত সেই ইঙ্গিতেই শিলমোহর। ইমপার (EIMPA)...

কীভাবে পুরসভার অধিবেশন বেআইনি বাতিল: পুলিশি তদন্তের দাবিতে থানায় চেয়ারম্যানের

কলকাতা পুরসভা শুক্রবার নজিরবিহীন অধিবেশন বাতিলের সাক্ষী থেকেছে। তার পরে বিজেপির কাউন্সিলররা বিধায়কদের নেতৃত্বে কলকাতা পুরসভাতেও (Kolkata Municipal...

শহরে আসছেন মার্কিন বিদেশ সচিব রুবিও: পরিদর্শনই উদ্দেশ্য

কোয়াড বৈঠকে যোগ দিতে তিনদিনের ভারত সফরে আসছেন আমেরিকার বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও। শনিবার কলকাতায় পৌঁছনোর কথা তাঁর।...

৩ কাউন্সিলরেই অনাস্থা! রাজ্য দখলের পরে কলকাতা পুরসভা দখলে বিজেপির হুঁশিয়ারিতে চক্রান্ত

কলকাতা পুরসভায় নজিরবিহীন অধিবেশনের সাক্ষী থেকেছেন শুক্রবার কাউন্সিলররা। বৈঠক ডাকা, বাতিল, ক্লাব রুমে অধিবেশনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এরপরই...