বিরুদ্ধে নয়, প্রশাসনের পাশেই দাঁড়ালো কোর্ট, কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

প্রশাসন-বিরোধী নয়, পুজো নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে নিশ্চিতভাবেই শাপে বর হয়েছে রাজ্য সরকারের৷

রাজ্য সরকার জানে, সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে, তা সামাল দেওয়ার পরিকাঠামোর অভাব আছে৷ ওনাম উৎসবের জেরে কেরল তছনছ করে দিচ্ছে করোনা-অসুর৷ সেই ছবি বাংলার চালচিত্রে ফুটে উঠলে সব আঙুল সঙ্গত কারনেই উঠতো প্রশাসনের দিকেই, যেমন আজ কাঠগড়ায় উঠেছে পিনারাই বিজয়ন সরকার৷
এসব জানা সত্ত্বেও কিছু করার ছিলো না প্রশাসনের৷ ইচ্ছা থাকলেও পুজো নিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করার অবস্থানে প্রশাসন ছিলো না৷ ঠিক সেই সময় আশীর্বাদের মতো এসেছে হাইকোর্টের পুজো-নির্দেশ, যে আদেশ হয়তো রক্ষা করেছে সরকারকে৷ তাই রাজ্যের বিরুদ্ধে নয়, আদালতের রায় আসলে রাজ্যের পক্ষেই গিয়েছে৷

করোনা-আবহে যাতে পুজোর ক’ দিনে জনসুনামি না হয়, সেজন্য চেষ্টাও করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তিনি বলেছিলেন, তৃতীয়ার দিন থেকে ভাগে ভাগে প্রতিমা দর্শন করুন মানুষ৷ মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রস্তাব মেনে, আজ, সোমবার থেকেই রাজপথে পর্যাপ্ত পুলিশি বন্দোবস্তও করা হয়েছে। সংক্রমণ ঠেকিয়েই প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থা কতখানি সফল করা সম্ভব, তার অগ্নিপরীক্ষাতে সোমবারই নেমেছে পুলিশ৷ ঠিক সেই সময়ে আদালতের এই রায় প্রশাসন এবং পুলিশের হাতকেই শক্ত করলো সন্দেহ নেই৷

আসলে এটা ভোটের বছর৷ হিন্দুত্বকে সামনে রেখেই যখন প্রধান বিরোধী দল ভোটের পসরা সাজিয়েছে, তখন দুর্গাপুজো নিয়ে একটু বেশি ঝুঁকিই নিতে হয়েছে শাসকদের৷ সন্দেহ নেই, এক্ষেত্রে ঝুঁকিটা প্রায় জুয়া খেলার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে৷ অনেকটা পেনাল্টি কিকের মতো৷ গোল দিলে বাহবা কম, মিস করলে মুখ দেখানোই দায়৷ রাজনীতির অঙ্ক এমনই হয়৷ ভোটের বছরে পুজোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করলে, বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে পুজোপ্রেমী মানুষের মধ্যে৷ এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন EVM পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে মরিয়া চেষ্টা করতোই বিরোধীরা, বিশেষত বিজেপি৷ ফলে সংক্রমণের কথা মাথায় থাকলেও, কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ ছিলো সংকীর্ণ ৷ হয়তো বা বিকল্প কোনও পথ খুঁজছিলো প্রশাসন৷ সেই পথটাই তো দেখালো আদালত ৷

রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের করোনা-রিপোর্ট ভয়ঙ্কর সংক্রমণের ছবি তুলে ধরা সত্ত্বেও, রাজ্যের ছোট-বড় সব কমিটিই নিজেদের মতো করে পুজো সফল করতে নেমেছে৷ সব ধরনের মিডিয়ায় সংক্রমণের থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পুজোর ছবি-খবর৷ আশ্চর্য হলেও এটা দেখতে হয়েছে, এই সংকটজনক পরিস্থিতিতেও বেশ কিছু মেগা-পুজো গর্বের সঙ্গে তাদের ‘থিম’ ঘোষণা করছে৷ এই মরিয়া চেষ্টার মূল উদ্দেশ্য, জনমানসে প্রতিমা দেখতে আসার একটা ইচ্ছা তৈরি করা৷
এই চেষ্টা কিছুটা ফলপ্রসূ হয়েছে৷ উদ্বোধন হয়ে যাওয়া মণ্ডপগুলিতে গত ২-৩ ধরে আতঙ্কজনক ভিড় হয়েছে৷ ভিড় করে কত মানুষ ঠাকুর দর্শন করবেন, তা আন্দাজ করার সুযোগ পুজো কমিটি বা প্রশাসনের নেই৷ সবটাই নির্ভর করে সাধারণ মানুষের উপরই৷ রবিবার লক্ষ্য করা গিয়েছে, ভয়ঙ্কর এই সংক্রমণ মাথায় নিয়েই মানুষ ঠাকুর দেখতে পথে নেমেছে, মণ্ডপে ঢুকেছে৷ এনাদের বদ্ধমূল ধারনা হয়েছে, করোনা ভাইরাস তাদের স্পর্শ করবে না৷ আর এই ভাবনায় চালিত হয়েই বিশাল এই দর্শনার্থী বাহিনী রবিবার কলকাতায় ভাইরাস ছড়ানোর মহান দায়িত্ব নিয়ে সপরিবারে পথে নেমেছিলেন৷ এই জনস্রোতকে পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বা পুলিশ ঠেকাবে কীভাবে ? ঠাকুর দেখতে আসা জনতাকে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে বাড়ি পাঠাতে পারবে না৷ মণ্ডপে ঢুকতে বাধা দিতে পারবে না৷ তাহলে মণ্ডপে জনস্রোত নিয়ন্ত্রণে আসবে কোন ম্যাজিকে ?

এখানেই নিরুপায় সরকার৷ সরকার বাঙালির মহোৎসবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে না, প্রতিমা দেখতে আসা জনতাকে ফেরত পাঠাতে পারবে না৷ অথচ সরকার উদ্বিগ্ন, সংক্রমণ ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে, মৃত্যুমিছিলও দীর্ঘায়িত হচ্ছে৷

ঠিক এই সময়েই রাজ্য সরকারের কাছে কার্যত হাঁফ ছেড়ে বাঁচানোর ডালি নিয়ে এসেছে হাইকোর্টের রায়৷ এই রায় রাজ্য সরকারকে মহাবিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে৷ সামাজিক দূরত্ববিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মাস্ক থুতনিতে ঝুলিয়ে ঠাকুর দেখার জনস্রোত রাজ্যকে মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতোই৷ অসহায়ভাবে সেই দৃশ্য দেখা ছাড়া প্রশাসনের বিকল্প কিছু ছিলো না৷
হাইকোর্টের রায় কার্যকর করে পুরোপুরি না হলেও মহাবিপদ হয়তো কিছুটা ঠেকানো যাবে৷

তবে এখন দেখার, কোনও ‘অদৃশ্য’ চাপে রাজ্য সরকার আবার এই রায়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে না পায়ে রাখে৷ তেমন হলে বলতেই হবে এই সরকার সত্যিই ‘হারাকিরি’ পছন্দ করে৷

আরও পড়ুন-অবিমৃশ্যকারিতা! কণাদ দাশগুপ্তর কলম