
‘ বলতে পারো সরস্বতীর মস্ত কেন সম্মান ? ‘ প্রশ্ন তুলেছেন বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘ বিদ্যাসুন্দর ‘ কবিতায় ।
উত্তরও দিয়েছেন তিনি এই কবিতারই একেবারে শেষে । কী সেই উত্তর ?
‘ বিদ্যা যাকে বলি , তারই আর একটি নাম সুন্দর । ‘ হংসপাখায় পাঁক লাগে না , সরস্বতীর আসনের এমনই মহিমা । এক হাতে প্রজ্ঞা , অন্য হাতে সুর । বই ও বীনা গায়ে গায়ে । শ্বেতশুভ্র বসনা এমন বিদুষী দেবী এ মহাবিশ্বে আর কোথায় ? সুরেশ্বরী ও বিদ্যাবতী তো বটেই , তিনি অনন্যা , তিনি সর্বগুণের অসামান্য আধার।
কথায় আছে , রূপে লক্ষ্মী , গুণে সরস্বতী । কিন্তু তিনি কি প্রেমের দেবী ? যদি না হন , তাহলে বাঙালির প্রেমের দেবী কে ?

মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথি বড়ো কাঙ্ক্ষিত বাঙালি ঘরের কিশোর-কিশোরীদের কাছে । বাগেশ্বরীর চরণে আমের মুকুল , দোয়াত ও কলম , বইপত্র আর সুর ও বাদ্যযন্ত্র মিলেমিশে একাকার সেদিন । আর হ্যাঁ , খড়ি । শিশুদের হাতেখড়ি হয় মাকে সাক্ষী রেখে , মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে । অ আ ক খ লিখে তবেই পাওয়া যায় বিদ্যাসুন্দরের সাধনক্ষেত্রে প্রবেশের মহামূল্য ছাড়পত্র । শুভ কাজে মনোনিবেশের অঙ্গীকার করতে হয় পুণ্যলগ্নে । একি শুধুমাত্র নিছক কিছু ধর্মীয় রীতিনীতির অনুশাসন মেনে গুরুগম্ভীর পূজার্চনার দিন ? একি শীতের শেষ পরশের আমেজ মেখে বসন্তকে আহ্বান জানানোর মহালগ্ন নয় ? বসন্ত পঞ্চমীর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আবেগে রোমাঞ্চে টইটম্বুর । এ সম্পর্ক যেন চিরকালের । লুকিয়ে চুরিয়ে , গুরুজন ও পাড়াপড়শিদের চোখ এড়িয়ে একরাশ বুক ঢিপঢিপ নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে প্রেমের প্রস্তাবনা , কি জানি কী হয় ! ও কি রাজি ? রাজি নয় ? তা কী করে হয় ?

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে … অঞ্জলি , উপোস , এতদিনের এতো কৃচ্ছসাধন , হলুদ শাড়ি , হলুদ অথবা পাটভাঙা সাদা পাঞ্জাবি , দুরুদুরু বুকে কাছে এসে দাঁড়ানো … একি কখনও ব্যর্থ হয় ? হতে পারে ? জয় হোক অবাধ্য কৈশোরের , জয় হোক পূজা ও প্রেমের । জয় মা , জয় মা সরস্বতী । বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও , সুর দাও , আর হ্যাঁ , হৃদয়ে প্রেম দিও একটুখানি ।


প্রেমের পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিও মাগো । ভ্যালেন্টাইনস ডে নয় , এ হলো বাঙালির নিজস্ব প্রেমের দিন । এ স্বতন্ত্র , এ বিশিষ্ট , এ অনুপম , এ অনন্য। পুজোর শেষে ভুরিভোজ । পাতপেড়ে খিচুড়ি ও বেগুনি ।
কোথাও বা বাসন্তী পোলাও , শীতের তরতাজা আনাজের পাঁচমিশালি তরকারি , চাটনি , পাঁপড় ও শেষপাতে নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা ।

তারপর ? তারপরই তো সেই শুভলগ্ন । হাতে হাত রেখে দাও ছুট । সফল সফর যদি না পড়ে ধরা । দুটি মন কাছাকাছি , এই ছিলো , হঠাৎই উধাও । যে কথা হয় নি বলা , আজ বলা যায় । এমন দিনে তারে বলা যায় ।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে কেনা পোশাক একেবারে নতুন চেহারা দেয় বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের ।
এই বিশেষ দিনটি বাঙালি কিশোরীর শাড়িতে নারী হয়ে ওঠার দিন । ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবী শোভিত বাঙালি কিশোর ছাত্রের সাবালক হয়ে ওঠার দিনও কি নয় এই দিনটি ?


আসলে আনন্দ বসন্তের সমাগম সম্ভাবনা ছাড়া দেবী সরস্বতীর আরাধনা ভাবাই যায় না । বসন্তই যেন রঙিন করে তোলে আপামর বাঙালিকে । আর তাই বোধহয় বাগদেবীর পূজার দিনটির অপর নাম , আসলে গোপন নাম ‘ প্রেমদিবস ‘ । এই একটি দিন ভালোবাসার হাত ধরে কোথাও তাদের হারিয়ে যাবার নেই মানা । দেবী কি নিজেও জানেন যে , উদ্দাম বাঙালি কৈশোরের প্রেমের দেবীও তিনিই ! তাঁর পূজা যদি বসন্তে না হয়ে হতো প্রবল গ্রীষ্মে অথবা দুরন্ত বর্ষায় , তাহলেও কি ভালোবাসা এমন দুহাত পেতে এসে দাঁড়াতো তাঁর দরজায় ? বসন্তের সঙ্গে প্রেমের যোগ যে চিরকালের । তাই তো বসন্তে যৌবনজলতরঙ্গ অপ্রতিরোধ্য ।
আর এই এক আশ্চর্য দেবী ! বিদ্যা , জ্ঞান , বৈদগ্ধ ও সঙ্গীতের অনন্ত আধার । ভালোবাসার এমন ভাঁড়ার , যে ভাণ্ডার বিবিধ রতনে অপরূপা , যার স্নিগ্ধ স্পর্শে জিভের জড়তা কেটে যায় , কেঁপে ওঠা কণ্ঠস্বর দৃঢ় ও প্রত্যয়ী হয় , সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব অতিক্রম করে মনের কথা প্রকাশ করার দুরন্ত স্পর্ধা অর্জন করে নিমেষে , সেই অসামান্য ভালোবাসার অপর নাম দেবী সরস্বতী ।
আরও পড়ুন- মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন খেলাধুলােয় : ব্রাত্য
_
_
