যারা চলে গিয়েছে যেতে দিন। নিজেকে আর পরিবার বাঁচাতে ধান্দাবাজরা বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কিন্তু যাদের ঘাম-রক্ত-পরিশ্রম-আত্মত্যাগের বিনিময়ে কেউ পঞ্চায়েত প্রধান, কেউ কাউন্সিলর, কেউ বিধায়ক বা সাংসদ, তাঁরা হলেন তৃণমূলের কর্মী। তাঁরাই থাকবেন। তাঁরাই গড়বেন। তাঁরাই সম্পদ। বৃহস্পতিবার উত্তর কলকাতার রামমোহন মঞ্চে কর্মিসভায় ফোন-বার্তায় কড়া ভাষায় ধান্দাবাজদের ধিক্কার জানিয়ে কর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রবল বর্ষণে শহর কার্যত ভাসছিল, অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার মাঝেও যেভাবে কর্মী-সমর্থক এবং নেতৃত্ব উপস্থিতিতে রামমোহন মঞ্চ উপচে পড়েছিল তা নিশ্চিতভাবে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপিকে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।

যেসব ধান্দাবাজরা দলবদলু হয়ে রাজনৈতিক শত্রীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তাদেরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন নেত্রী। বলেন এতটুকু ধৈর্য নেই। লজ্জার বিষয়, যাদের বিরুদ্ধে লড়লাম তাদের দলে নাম লেখাচ্ছে। এর থেকে ভাল ছিল ওরা বিজেপিতে চলে যেত। শুধু পরিবারের কী হবে, সম্পত্তির কী হবে এসব ভেবে হাত মেলাল। ফোন-বার্তায় নেত্রীর স্পষ্ট কথা, এদের ক্ষমা নেই। কেউ ক্ষমা করবে না। যাঁরা ভাবছেন আজ বেঁচে গিয়েছেন, তাঁরা জেনে রাখুন কাল জনগণ তাদের কাছেই কৈফিয়ত চাইবে। নেত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, আপনার মা আপনাকে মানুষ করলেন। আর যখন আপনার মা অসুস্থ তখন তার দেখভাল করবেন না! এটা কোনও সন্তানের কাজ নয়। আজকে যারা শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তারা যদি বিপক্ষ শিবিরে না যেতেন তাহলে এই আক্রমণ, অত্যাচার করার সাহস পেত না বিজেপি। এরা তো কেউ এলাকায় ঢুকতেই পারছে না। মুখে বলছে কর্মীদের বাঁচাতে গিয়েছে। আসলে ওরা নিজেদের টাকা বাঁচাতে গিয়েছে।
নেত্রী বলেন, ধমকানি-চমকানি চলছে। মিটিং-মিছিল করতে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতি এইরকম। প্রতিদিন আমি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। আমি এখনও বিশ্বাস করি, কর্মীরাই নেতা তৈরি করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহ্বান, যাদের সুবুদ্ধি আছে তারা ফিরে আসুন। আর যদি কেউ ভেবে থাকেন এর থেকে বাঁচবেন, তাহলে জেনে রাখুন তারা হবেন না ঘরকা না ঘাটকা। আমরা রক্ত দেব দলের জন্য। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসকে বিক্রি করে দিয়ে কর্মীদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে টাকার লোভে আর কেস থেকে বাঁচতে মাথা নত করব না।

রাজ্য পুলিশের আচরণ দেখে বিস্মিত নেত্রী। বলেন পুলিশ কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু এ-পুলিশ অচেনা। পুলিশ দাঁড়িয়ে এমএলএ-দের বলছে গাড়ি এনেছি উঠুন। এটা পুলিশের কাজ? শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে পুলিশ। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকবে। কিন্তু এখন যা ইচ্ছে তাই করছে।

২১ জুলাই শহিদ তর্পন প্রসঙ্গ টেনে নেত্রী বলেন, বছরে একটি কর্মসূচি থাকে আমাদের। ঝড়-জল উপক্ষা করে এই কর্মসূচি করতে হবে। পাঁচজন থাকলেও সেই কর্মসূচি আমরা করবই। ধর্মতলার সভাকে সামনে রেখে সমস্ত কর্মীকে আহ্বান সংযত হন, সংগঠিত হন, লক্ষ্যে স্থির থাকুন একুশের ধর্মতলার সভার জন্য।

নিজের পরিবারের উপর বিজেপির অত্যাচার বলতে গিয়ে বলেন, অভিষেকের বাবা-মা-সহ আরও দু’জন ভাই-বোন আছেন। অভিষেককে প্রতিদিন কোর্টে বা এজেন্সির কাছে যেতে হচ্ছে। মিড-ডে মিলে ডিম হারিয়ে যাচ্ছে। আর বিজেপি কর্মীদের ডিম দিয়ে বলা হচ্ছে তৃণমূল কর্মীদের ছোঁড়ো। যা খুশি তাই করছে। অসম্মান করছে। অসভ্যতা করছে। মিডিয়া তো বিক্রি হয়ে গিয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলিকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এটা গণতন্ত্র? সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি বিরোধিতা করায় অনেককে গ্রেফতারও করা হচ্ছে। বিজেপির টার্গেট ওয়ান পার্টি ওয়া নেশন। আমরা মানছি না। মানব না। সংবিধান হত্যা দিবস করছে বিজেপি। হাস্যকর। দেশে গণতন্ত্র আছে? সংবিধানকে মানা হয়? আইনের শাসন আছে? যথেচ্ছচার চলছে। আবার কেউ কেউ ভাবছে বাংলায় ক্ষমতায় এসে রাজ্যটাই তার জমিদারি। এর বিরুদ্ধে আপনাদেরকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। আজ দরকার আত্মত্যাগ। আজ সকলকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সংগঠিত শক্তি নিয়ে লড়াই করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেস আবার ঘুরে দাঁড়াবেই। আর তা আপনাদের হাত ধরেই। রাজনীতিতে জোর করে হারানো হয়েছে আমাদের। এসআইআর থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, এমনকি গণনাকেন্দ্রেও ভোটলুঠ হয়েছে। আমরা হারিনি। আমাদের হারানো হয়েছে।

নতুন বিধায়কদের উদ্দেশ্য করে বলেন, কর্মীদের সম্মান দিন। কর্মীদের দিকে তাকান। নইলে কর্মীরাই আসল চেহারা দেখাবে। যারা অন্য দলের যাবার চেষ্টা করছেন তাদের বলি তৃণমূলের প্রতি আস্থা রাখুন, ভরসা রাখুন। লোডশেডিং থেকে জল জমা কিংবা ট্রাফিক পরিস্থিতি দেখলেই বোঝা যাবে এই ক’দিনে কী হয়েছে। আমাদের পাওনা টাকা ওদের দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অত্যাচার হলে জবাব মানুষকেই দিতে হবে। কর্মীদেরই দিতে হবে।

আরও পড়ুন- দিদির সঙ্গেই আছি, থাকব! দুর্যোগ উড়িয়ে শপথ জেলা তৃণমূলের কর্মিসভায়

_
_
_
_
