বেছে বেছে শুধু নায়িকারা, ধোওয়া তুলসিপাতা সঞ্জুরা? বিজেপির ড্রাগ রাজনীতি, অভিজিৎ ঘোষের কলম

অভিজিৎ ঘোষ

বেছে বেছে নায়িকারা। হলো কী মুম্বইয়ের? ড্রাগ, গাঁজা, চরসে অভ্যস্ত শুধু মুম্বইয়ের নায়িকারা? নায়করা সব ধোওয়া তুলসিপাতা? চক্রান্তের কড়া গন্ধ এখন মেরিন ড্রাইভ জুড়ে। আর এর পিছনে বিজেপির সাজানো স্ক্রিপ্টের কথা আনাচ-কানাচে।

মুম্বইয়ে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, মোদি সরকারের দ্বিতীয় জমানা আসলে প্রতিশোধের জমানা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না, তাই অনৈতিকভাবে রাজ্যসভায় ধ্বনিভোটে বিল পাশ হচ্ছে। আবার যারা অন্য কাজে পরিচিত মুখ, তাঁরা সরকার বিরোধিতা করলেই সামান্য অপেক্ষা। তারপর জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা তদন্তে। তাই হাস্যকর ভঙ্গিতে দিল্লি দাঙ্গায় সীতারাম ইয়েচুরি থেকে বৃন্দা কারাতের নাম চার্জশিটে নিয়ে আসা হয়েছে।

দীপিকার ড্রাগ প্রেমে এত রোষাণল কেন? প্রথমত রাহুল গান্ধীকে তিনি প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েছিলেন। শুধু কী তাই! জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় দীপিকা ঐশী ঘোষেদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যে। তারপর কী হল? দীপিকার ‘ছাপাক’ ছবি রিলিজে বিজেপির লেজুড় বাহিনীর নিষেধাজ্ঞা। আক্রমণে শালীনতা হারিয়ে অভিনেত্রীর ফিল্ম বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, দীপিকাকে বলা হল ‘দেশদ্রোহী’!

শুধু দীপিকা কেন? অনুরাগ কাশ্যপের কথাই ধরা যাক না কেন! বিগত কয়েক বছরে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যে লোকটা শাসক দলকে সকাল-বিকেল খাস্তা করতেন, তিনি অনুরাগ। তাঁকে ফাঁসানো যাচ্ছিল না। তাই ‘মি টু’। এই অভিযোগগুলো খায় না মাথায় দেয় তা পুলিশই জানে! সব অভিযোগ ১০, ৭, ৫ বছর পর হচ্ছে। মানে কী? এতদিন সম্মানহানি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কীভাবে এনারা? ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন নাকি? বেশ অভিযোগ সব সময় অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে প্রামান্য তথ্য কোথায়? যদি তথ্য দিয়ে প্রমাণে সেই অভিনেত্রী ব্যর্থ হন, তাহলে সর্বসমক্ষে সম্মানহানির অভিযোগে সেই অভিনেত্রী গারদের বাইরে থাকবেন কোন যুক্তিতে? প্রশ্ন, এই ক’বছরে কোনও অভিনেত্রী বা বিশিষ্ট কেউ ‘মি-টু’র অভিযোগ করেছেন, আর তা প্রমাণ করতে পেরেছেন, এমন উদাহরণ আছে কি!

মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বেশিদূর যেতে হবে না। নায়করা একেকজন ‘এক সে বড় কর এক’। তাঁরা তো ড্রাগ নেওয়ার জন্য বিখ্যাত। সঞ্জয় দত্ত – ড্রাগ নিয়ে সেটে শুটিং করতে করতে পড়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ চেষ্টায় ছেড়েছেন। ফারদিন খান – ড্রাগের চক্করে ফিল্ম কেরিয়ার শেষ। কোকেন সহ ধরা পড়েছিলেন। রনবীর কাপুর – বহু সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন, নিয়মিত মারিজুয়ানা নিতেন। বিজয় রাজ – মারিজুয়ানা সহ দুবাই এয়ারপোর্টে ধরা পড়েন। শাহরুখ খান বার্লিন এয়ারপোর্টে ধরা পড়েন মারিজুয়ানা সহ। ছাড়া পেয়ে যান ব্যক্তিগত ব্যবহারের আইনে। তালিকা আরও বড় করা যায়।

আরও পড়ুন- ২১ বার চেষ্টা করেও আধার কার্ড মেলেনি, মামলা হলো মোদির বিরুদ্ধে

তাহলে? দীপিকা, সারা, শ্রদ্ধা, রকুলপ্রীত, খাম্বাটা সহ নায়িকারা কেন? মুম্বইয়ে যারা বিজেপির এই ড্রাগ রাজনীতি ধরে ফেলেছেন, তাঁরা বলছেন, এর পিছনে বেশ কিছু কারণ আছে।

১. পুরুষতান্ত্রিকতায় ঘোর বিশ্বাসী বিজেপির তাবড় নেতারা। ফলে সফল ও কৃতী মহিলাদের টার্গেট করে বিপদে ফেললে বাকিরা সমঝে যাবে। যারা সরকারের বিরুদ্ধে মাথা তোলার চেষ্টা করছে, তারাও মানে মানে মুখে কুলুপ আঁটবে। হয় বিজেপির পাশে থাক, নইলে গরাদের মধ্যে থাক, ভাবখানা এইরকম।

২. দীপিকা থেকে অনুরাগ আসলে স্যাম্পল টেস্ট। সেই কারণেই শিবসেনাকে সবক শেখাতে কঙ্গনাকে ‘ব্যাক’ করা বা তাকে ‘ওয়াই ক্যাটেগরি’ নিরাপত্তা দেওয়ার মতো অনৈতিক কাজ করতেও এতটুকু বিবেকে লাগে না বিজেপির। কারণ, কঙ্গনা বিজেপির পারপাস সার্ভ করছে যে! অর্থাৎ হয় তুমি দেশপ্রেমী, আর প্রশ্ন তুললেই তুমি দেশদ্রোহী।

৩. আসলে এটাই গেরুয়া রাজনীতির মূল কথা। কে সুশান্ত সিং রাজপুত? একজন অভিনেতা। তার অকাল মৃত্যু। তদন্ত হোক। তার জন্য রাকেশ আস্থানাকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলো মুম্বইতে! জোট ভাঙার কারণে দরকার শিবসেনাকে সবক শেখানো। তাই পাঠাও কোনও রাজদূত!

আরও পড়ুন- মুসলমান পরিবারের সন্তান দুর্গাপুজো নিয়ে মেতেছেন? মীরকে নিশানা মৌলবাদীদের

৪. বিহার ভোটের কথা মাথায় রেখে সুশান্ত আবেগ জিইয়ে রাখা। তার বাবাকে মসিহা বানানোর চেষ্টা। ব্যর্থ সিবিআই মৃত্যুর কারণ খুঁজতে। তাই তদন্তে ট্যুইস্ট আনতে ড্রাগ জটিলতা সামনে এনে তদন্তে নতুন টার্ন দেওয়ার চেষ্টা।

৫. আর একটা বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে, তা হলো বাঙালি বিরোধিতায় সুরসুরি দেওয়া। রিয়া থেকে শুরু। কোথায় ছিলেন পায়েল? তিনিও এলেন। এবার কলকাতা নাইট রাইডার্স। বিহারের পর বাংলায় যে ভোট রয়েছে, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

মুম্বই বলছে ড্রাগ রাজনীতি। আওয়াজটা বাড়ছে। এই যে সাদা দাড়ি আর সাদা চুলের ইমেজ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটা সাধু-সাধু ইমেজ সামনে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, সেটা কিন্তু আসলে মুখোশ। গেরুয়া রাজনীতি দিয়ে দেশের মাজা ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর দফারফা করা। রেল থেকে কয়লা, কৃষি থেকে শ্রম বিল, সব যে আসলে হাতুড়ি দিয়ে বামিয়ানে তালিবানিদের বুদ্ধমূর্তি ভাঙার চেষ্টা, সে নিয়ে কারওর সন্দেহ আছে নাকি!

আরও পড়ুন- মীরদার কথায় আপনার মজা লাগে, হাসি পায়- হাসির তো ধর্ম নেই, তাই না?