বয়স তখন সবে ৮ কি ৯, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের ভর্তি করিয়েছেন অভিভাবকরা। থাকতে হবে হস্টেলে। হাতে ট্রাঙ্ক নিয়ে একদল শিশু দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। কেউ কাউকে চেনে না। সালটা ১৯৬৯। সেই থেকেই বন্ধুত্ব। আর সে বন্ধুত্ব এমনই যা কি না ছাপিয়ে যায় রক্তের সম্পর্ককেও। অন্তত এমনটাই মনে করেন ওই স্কুলের প্রাক্তনী চিকিৎসক শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। সেই বন্ধুত্বের ৫০ বছর উদযাপনে বৃহস্পতিবার নিউটনের বিজনেস ক্লাবে জড়ো হয়েছিলেন ১৯৭৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। যাঁরা স্কুলে ভর্তি হন ১৯৬৯। অনেককেই এখন চেনা যাচ্ছে না। আজও মনের মধ্যে সেই ছোটবেলার মুখটাই রয়েছে। সবাই আবেগাপ্লুত, কথা বলতে গিয়ে আবেগে গলা ধরে আসছে। সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করা যায়নি বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে। কারণ, অনেকে চলে গিয়েছেন না-ফেরার দেশে। সেইসব বন্ধুদের স্মরণ করতে গিয়ে মঞ্চে সবার সামনেই কেঁদে ফেললেন আপাত আমুদে তুহিনকান্তি ভট্টাচার্য।


বন্ধুত্বের পঞ্চাশ বছর উদযাপনে প্রিয়, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদেরও ডেকেছিলেন পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের উনিশশো ছিয়াত্তরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। ৪৩ বছর পরে ছাত্রদেরকে ডাকে আপ্লুত স্বামী বিশ্বনাথানন্দজি মহারাজ, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিশ্বরূপ দত্ত।
হস্টেল জীবন শেষ হয়ে গিয়েছে অনেকদিন। তবু সেই স্বাদ ফিরে পেতে বুধবার রাতে সহপাঠী দেবাশিস মিত্রর বাড়িতে ছিলেন প্রাক্তনীরা, ছুঁয়ে দেখতে শৈশবকে।
স্কুল ছাড়ার পরে অনেকের সঙ্গে দেখা হল প্রায় ৪০ বছর পরে। মনের মধ্যে গাঁথা রয়েছে সেই ছোটবেলাকার মুখ। এতদিন পরে পরিণত চেহারাটা চিনতে পারেন যাচ্ছে না। তবু একবার নাম, পরিচয় দেওয়ার পরেই যেন আবার সেই জায়গা থেকেই কথা শুরু হল যেখানে শেষ হয়েছিল। মঞ্চে অনেকেই ছোটবেলাকার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। জানালেন কীভাবে আম চুরি করতেন। ক্রিকেট খেলা থেকে শিক্ষক রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি স্থাপত্য ভেঙে ফেলা- সব কিছুর অকপট স্বীকারোক্তি হল এদিনের মঞ্চে। কারণ ছোটবেলাকার বন্ধুদের কাছে কিছুই তো গোপন নেই।

এদিনের অনুষ্ঠানে একটি সুভেনিয়র প্রকাশ করা হয়। প্রকাশ করা হয় একটি স্মারক, যেখানে ছবি রয়েছে ১৯৭৬-এর মাধ্যমিক ব্যাচের। সবাইকে জোগাড় করতে না পারলেও এই অনুষ্ঠানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা শিক্ষকদের সঙ্গে আবার গ্রুপ ফটো তুললেন। উদ্দেশ্য উনিশশো ছিয়াত্তর আর ২০১৯ কে পাশাপাশি ফ্রেমবন্দি করে রাখা।


অনুষ্ঠানের অপর উদ্যোক্তা নিরঞ্জন গোস্বামী জানালেন ভর্তির ৫০ বছর যেমন উদযাপন করা হল, তেমনই ২০২৬-এ মাধ্যমিক পাশের ৫০ বছর উদযাপন করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের। আর ডাক্তার শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শুধু গেট টুগেদার, খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা নয়, এই ইউনিয়ন থেকে তাঁরা গঠনমূলক কিছু করতে চান। অনেকেই আছেন যাঁরা বিদেশে থাকেন বা যাঁরা এখানে আছেন সবাই মিলে একটি ফান্ড করতে চান। সেই তহবিল থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের পড়ুয়াদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সাহায্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেহেতু অনেক চিকিৎসক রয়েছেন এই ব্যাচে, সে কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও সাহায্যের ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের। তবে এদিন কোনও পরিকল্পনা নয়, গুরুগম্ভীর আলোচনা নয়, শুধু আনন্দ হইচই। প্রাক্তনীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। বন্ধু, বন্ধু পত্নী এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এ যেন এক বৃহৎ পরিবার। যেখানে একটাই কথা
“বন্ধু চল, বলটা দে
রাখবো হাত তোর কাঁধে,
গল্পেরা ওই ঘাসে
তোর টিমে, তোর পাশে।”



