“পরীক্ষা এত ভালো হয়েছে যে স্বয়ং ঈশ্বরও আমাকে সফল হওয়া থেকে আটকাতে পারবেন না”— গত ৩ মে নিট (NEET) পরীক্ষা দিয়ে এসে রাজস্থানের (Rajsthan) এক দলিত যুবক তাঁর দিনমজুর বাবাকে এই কথাই বলেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল হতেই মন ভাঙে তাঁর। তিন দিন পর নিজের ঘরেই আত্মঘাতী হন ওই যুবক। তবে এটি একটা ঘটনা নয়। বেশ কয়েক বছর ধরে লাগাতার ফাঁস হচ্ছে ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র। যার জেরে সারা দেশজুড়ে চরম হতাশায় ভুগছে পরীক্ষার্থীরা। চলতি বছরের ৩ মে তারিখে এবারের নিট পরীক্ষা নেয় NTA। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের পর ২১ জুন ফের পরীক্ষার দিন ঘোষণা করে NTA। ৩৭ দিনের মধ্যে ১২ জন পরীক্ষার্থী এখনও পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন, এই যুবক তাঁদের মধ্যে একজন।

চরম আর্থিক অনটনের মধ্যেও সিকারে থেকে পড়াশোনা করছিলেন এক ২২ বছর বয়সী যুবক। গত ১৮ মে বোন স্নান করতে যাওয়ার সুযোগে তিনি ঘরে গলায় ফাঁস লাগান। ছেলের এই মর্মান্তিক পরিণতির পর ক্ষুব্ধ পরিবার সরকারের কাছে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ও চাকরির দাবিতে চিতাভস্ম বিসর্জন দিতে অস্বীকার করেছে। এখানেই ১৫ জুন মুম্বইয়ের এক ব্যবসায়ীর ২২ বছর বয়সী ছেলেও গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, “আমাকে ক্ষমা করো।” এর আগে ১২ মে ১৭ বছরের এক হকি খেলোয়াড় কিশোর চিরকুট লিখে যায়, সে আর কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে চায় না। আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গ দিবস-শ্যামাপ্রসাদ ভূমিকা রাখা হোক পাঠ্যবইয়ে: দাবি সুকান্তর, আর্জি আরও ২ মন্ত্রীর

আহমেদাবাদে এক ১৭ বছরের কিশোর ১৮ জুন মধ্যরাতে বহুতলের বারান্দার জাল কেটে নিচে ঝাঁপ দেয়। অন্যদিকে ইন্দোরে এক সরকারি চিকিৎসকের ১৯ বছর বয়সী মেয়েও বহুতল থেকে নিচে পড়ে মারা যান। পরীক্ষার তারিখ যত এগিয়ে আসছিল, মেয়েটি তত চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল বলে জানায় পরিবার। কোয়েম্বাটুরের ১৯ বছরের এক তরুণী দু’বার ব্যর্থ হওয়ার পর এবার পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় তীব্র আতঙ্কে ভুগছিলেন। ১৭ জুন আত্মীয়দের হোয়াটসঅ্যাপে আবেগঘন মেসেজ পাঠিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। মহারাষ্ট্রের নাগপুরের এক রাঁধুনির ১৮ বছর বয়সী মেয়ে ৩ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে কোচিং করছিলেন। ২০ মে আত্মঘাতী হওয়ার আগে তিনি লিখে যান, “মা-বাবা, তোমাদের বিশ্বাস ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে, কিন্তু আমার আর নতুন করে পরীক্ষা দেওয়ার সাহস নেই।”

গত ১৬ জুন এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীর ২৪ বছর বয়সী মেয়ে ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মঘাতী হন। পুনঃপরীক্ষা নিয়ে তীব্র ট্রমার মধ্যে থাকা মেয়েটি বাবার উদ্দেশ্যে লিখে যান, “আই লাভ ইউ পাপা, আই অ্যাম সরি। এর জন্য কেউ দায়ী নয়, আমার নিজের অযোগ্যতাই এর কারণ।” লখনউয়ের এক রেল কর্মকর্তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে এবং লাখিমপুর খেরির এক ২১ বছর বয়সী যুবকের গল্পও একই রকম। পরীক্ষা বাতিলের পর থেকেই গভীর অবসাদে ভুগছিলেন তাঁরা। উত্তর দিল্লির আজাদপুরের ২০ বছর বয়সী এক তরুণী, যিনি গত বছর মাত্র ৪ নম্বরের জন্য সুযোগ পাননি, তিনিও ১২ মে পরীক্ষা বাতিলের মাত্র দু’দিনের মাথায় নিজের জীবন শেষ করে দেন। ২৫ মে লাতুরের আরও এক ১৮ বছরের তরুণী ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রাণ হারান।

প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি আর পরীক্ষা বাতিলের এই ধারাবাহিক চক্র আজ দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একের পর এক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর এই আত্মহনন কেবল তাঁদের পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম ও নির্মম ব্যর্থতারই প্রমাণ।

–

–

–
–
–
