শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং ঋণের বোঝা ক্রমেই চেপে বসছে। সেই আর্থিক সঙ্কটের আঁচ এ বার সরাসরি গিয়ে পড়েছে সে দেশের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া পাওনা এবং নতুন করে বাড়তি মাশুল ধার্য হওয়াকে ঘিরে দিল্লির সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যে বেজিংয়ের দ্বারস্থ হওয়ার বার্তা দিয়েছিল ঢাকার তারেক রহমান সরকার। এমনকি চিনের কাছ থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কেনার ব্যাপারে তৎপরতাও শুরু হয়েছিল বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু যাবতীয় গর্জন কার্যত ব্যর্থ প্রমাণ করে দিনের শেষে ভারতের আদানি গোষ্ঠীর বিদ্যুতেই ভরসা রাখতে হচ্ছে ঢাকাকে। ঝাড়খণ্ডের পরিকাঠামোগত ত্রুটি মিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতেই ওপার বাংলায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মেঘ কাটতে শুরু করেছে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার মাঝেই গত ১১ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রে আচমকা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে কেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিটে ত্রুটির কারণে উৎপাদন সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ সূত্রে খবর, যান্ত্রিক গোলযোগের আগে ওই কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ পাচ্ছিল তারা। কিন্তু একটি ইউনিট স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ এক ধাক্কায় ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। ফলে ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুরু হয় তীব্র লোডশেডিং। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রুটি সারিয়ে ফেলে সংশ্লিষ্ট ইউনিটটি চালু করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ফের আগের মতো স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন আদানির সংস্থার কাছ থেকে ধারে যে বিদ্যুৎ নিয়েছিল, তার কোটি কোটি টাকা এখনও মেটাতে পারেনি বাংলাদেশ। এই টানাপড়েনের মধ্যেই সম্প্রতি বাংলাদেশে রফতানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি (এসএনএ) চার্জ আরোপ করেছে নয়া দিল্লি। গ্রিড পরিচালনা ও লেনদেনের নিষ্পত্তির কারণে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে অতিরিক্ত ০.০০৫ টাকা মাশুল ধার্য হওয়ায় গোঁসা হয় ঢাকার। বিদ্যুৎ আমদানির জন্য চিনের দিকে ঝুঁকতে চেয়ে কার্যত দিল্লিকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছিল তারেক সরকার। কিন্তু বাস্তব পরিকাঠামো ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় সেই প্রচেষ্টা কার্যত হালে পানি পায়নি।

বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে এনটিপিসি থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, ডিভিসি থেকে ৩০০ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট এবং পিটিসি ও সেম্বকর্পের মাধ্যমে আরও ৪৫০ মেগাওয়াট মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটের জন্য নতুন এসএনএ চার্জ কার্যকর হচ্ছে। অন্য দিকে, ঝাড়খণ্ডের গড্ডা প্রকল্প থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াটের যে চুক্তি রয়েছে, সেখানে এই চার্জ আগে থেকেই যুক্ত। ফলে দিল্লিকে এড়িয়ে বা চিনা নির্ভরতা বাড়িয়ে যে বাংলাদেশের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এই মুহূর্তে কার্যত অসম্ভব, আদানির সরবরাহ স্বাভাবিক হতেই তা ফের স্পষ্ট হয়ে উঠল।