হাওড়ার সাঁকরাইলের বাণীপুরের হাটগাছা এলাকা। আপাতশান্ত এই প্রত্যন্ত এলাকাটিই এখন রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। নেপথ্যে রয়েছে ‘এনসিপিআই’ নামের একটি অখ্যাত রাজনৈতিক দল, যার প্রধান কার্যালয়কে ঘিরে এখন রহস্যের দানা বাঁধছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা কেন হঠাৎ এমন একটি অখ্যাত দলে যোগ দিলেন, তা নিয়েই এখন চায়ের দোকানে জোর চর্চা। সোমবার দিনভর ওই কার্যালয়ের সামনে উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। গোটা এলাকা মুড়ে ফেলা হয়েছে কড়া নিরাপত্তার চাদরে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই এনসিপিআই দলটির গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০২২ সালে, হাটগাছার এই সাধারণ বাড়িটি থেকেই। দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উত্তীয় কুন্ডু এবং প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষ তাঁর স্ত্রী শিউলি কুন্ডু। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাঁকরাইল ব্লকের বিভিন্ন পঞ্চায়েতের ১১টি আসনে এই দলের প্রার্থীরা লড়াই করলেও সবকটি আসনেই তাঁদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর ২০২৪-এর লোকসভা বা ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে তাঁদের আর কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় ঝোড়হাট ও দুইল্যার গ্রাম পঞ্চায়েতের কয়েকটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরই তাঁরা প্রথম এই দলের নাম জানতে পারেন।
এলাকায় গিয়ে জানা যায়, রাজনৈতিক দলের আড়ালে আসলে এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কার্যালয় ছিল। ২০১৮ সাল থেকে উত্তীয় ও শিউলি এখানে ‘জাগোবিশ্ব’ নামে একটি এনজিও এবং হোম চালাতেন। সেখানে এলাকার গরিব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হতো। পাশাপাশি একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রও চালানো হতো, যা দীর্ঘদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দম্পতির বাড়ির প্রবেশদ্বারে তাঁদের যে পরিচয় লেখা রয়েছে, তা দেখে যে কেউ চমকে যাবেন। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, উত্তীয় বাবু একাধারে অঙ্কের শিক্ষক, স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা, যোগা প্রশিক্ষক, সোলার টেকনিসিয়ন এবং বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদক। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী শিউলি দেবী পেশায় আইনজীবী হলেও তাঁর অঙ্কে ডিপ্লোমা এবং ডিটিপি প্রশিক্ষণসহ একাধিক বিষয়ে যোগ্যতা রয়েছে।
সোমবার ওই কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, বাড়িতে উত্তীয় বা শিউলি কেউই নেই। বাড়িতে উপস্থিত এক কিশোরী নিজেকে তাঁদের সন্তান পরিচয় দিয়ে জানায়, বাবা-মা বাড়িতে নেই। তবে এখানেই যে ২০২২ সালে এনসিপিআই দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তা সে স্বীকার করেছে। ফোনে যোগাযোগ করা হলে শিউলি কুন্ডু জানান, তাঁরাই ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গে এই দলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং রাজ্যে তাঁদের আর কোনও কার্যালয় নেই। তবে তিনি আরও দাবি করেন, ২০ দিন আগেই তিনি এই দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন চার চাকা গাড়ি করে বাইরে থেকে বহু মানুষ এই বাড়িতে আসতেন। কিন্তু বাড়ির মালিকরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করতেন না। বর্তমানে ওই বাড়ির ভেতরে ১০-১২ জন কিশোরী আবাসিক রয়েছে, যারা উত্তীয় ও শিউলিকে ‘বাবা-মা’ বলে সম্বোধন করে। তবে তারা শিউলিদের নিজেদের সন্তান নাকি হোমের আবাসিক, তা স্পষ্ট নয়। এলাকাবাসীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা এই দম্পতির তৈরি অখ্যাত দলে কীভাবে তৃণমূলের হেভিওয়েট বিদ্রোহী সাংসদরা নাম লেখালেন, তা নিয়েই এখন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে এলাকায়। ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন- দলের টাকায় নতুন গাড়ি কেনার আবদার সুদীপের! ‘অবাঞ্ছিত অতিথি’দের তীব্র কটাক্ষ কুণালের
_
_
_

_
