উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন সংগীতসাধক, বহু বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী, সুরকার, শিক্ষক, উদ্ভাবক এবং একজন সঙ্গীত-স্থপতি। তাঁর হাতে মাইহার ঘরানা শুধু একটি বাদনরীতি হয়ে ওঠেনি; তা পরিণত হয়েছিল এমন এক গুরু-শিষ্য পরম্পরায়, যার প্রভাব ভারত ছাড়িয়ে পশ্চিমের শ্রোতৃসমাজ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ৬ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর প্রয়াণদিবস। স্মরণ করলেন নুরুল ইসলাম বাবুল
উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি
“Baba was my Guru—but he was also like a father to me.” — পণ্ডিত রবিশঙ্কর। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য পণ্ডিত রবিশঙ্করের এই স্মৃতিচারণ কেবল একজন গুরুর প্রতি একজন শিষ্যের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নয়; এটি বিশ শতকের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অসামান্য উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি। রবিশঙ্কর আরও বলেছিলেন, আলাউদ্দিন খাঁ একই সঙ্গে ছিলেন “a strict traditionalist and a creative genius” — কঠোর ঐতিহ্যবাদী এবং সৃষ্টিশীল প্রতিভা। তাঁর উদ্ভাবনের প্রভাব হিন্দুস্তানি যন্ত্রসঙ্গীতে দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেও তিনি মনে করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আলাউদ্দিন খাঁর মৃত্যু হয়েছিল; কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের মৃত্যু ঘটেনি। বরং তাঁর শিষ্য, তাঁদের শিষ্য এবং তাঁদের সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তাঁর সাধনা এক শতাব্দী অতিক্রম করে আজও প্রবহমান।
এই কারণেই আলাউদ্দিন খাঁকে কেবল সরোদবাদক বললে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সংকুচিত করা হয়। তিনি ছিলেন সঙ্গীতসাধক, বহু বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী, সুরকার, শিক্ষক, উদ্ভাবক এবং সবচেয়ে বড় কথা— একজন সঙ্গীত-স্থপতি। তাঁর হাতে মাইহার ঘরানা শুধু একটি বাদনরীতি হয়ে ওঠেনি; তা পরিণত হয়েছিল এমন এক গুরু-শিষ্য পরম্পরায়, যার প্রভাব ভারত ছাড়িয়ে পশ্চিমের শ্রোতৃসমাজ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
প্রথম পাঠশালা বাংলার জনজীবন
আলাউদ্দিন খাঁর জীবনের প্রথম ভূগোল ভারত নয়, বাংলা। আজকের বাংলাদেশ। ১৮৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের এক সঙ্গীতপরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা সবদর হোসেন খাঁ ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ; বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছেই তাঁর সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা। বাংলাদেশের সরকারি তথ্যভাণ্ডার এবং বাংলাপিডিয়াও তাঁর জন্মস্থান ও পারিবারিক সঙ্গীতপরম্পরার এই তথ্য নিশ্চিত করে। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল সঙ্গীতের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ। মাত্র দশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে একটি যাত্রাদলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। এই ঘটনাটি তাঁর জীবনের নিছক রোমাঞ্চকর অধ্যায় নয়; তাঁর সঙ্গীতদর্শনের ভিত তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। যাত্রাদলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে তিনি জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন ও পাঁচালির মতো বাংলার নানা লোকধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে তাঁর সঙ্গীতশিক্ষার প্রথম পাঠশালা ছিল কোনও রাজদরবার নয়— ছিল বাংলার জনজীবন। The Daily Star-এর আলাউদ্দিন খাঁ-সংক্রান্ত জীবনীমূলক প্রতিবেদনে তাঁর এই শৈশব-পর্বের উল্লেখ রয়েছে। এই দিকটি আলাউদ্দিন খাঁকে বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী জীবনে তিনি যতই সেনিয়া পরম্পরা, ধ্রুপদ, সরোদ কিংবা মাইহার ঘরানার সঙ্গে যুক্ত হন না কেন, তাঁর সঙ্গীতের গভীরে লোকসুরের প্রতি এক সহজাত গ্রহণক্ষমতা ছিল। তাঁর সৃষ্ট রাগগুলোর কয়েকটির সঙ্গে লোকসুরের সাদৃশ্য নিয়েও পরবর্তী সময়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গীতচর্চায় তাঁর সৃষ্ট মঞ্জ খামাজ ও হেমন্ত আজও পরিবেশিত হয়।
সঙ্গীতজীবনে নতুন বাঁক
বাংলার গ্রাম থেকে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য কলকাতা। সেখানে তিনি গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, অর্থাৎ নুলো গোপালের কাছে তালিম নেন। নুলো গোপালের কাছে দীর্ঘ সাধনার পর তাঁর সঙ্গীতজীবন নতুন বাঁক নেয়। এরপর তিনি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষার্থী থাকেননি; একের পর এক যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন— সেতার, বাঁশি, পিকোলো, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো, বেহালা, শানাই, পাখোয়াজ, তবলা প্রভৃতি। বাংলাদেশের পত্রিকা The Daily Star-এর সংরক্ষিত প্রতিবেদনে তাঁর কলকাতা-পর্বে অমৃতলাল দত্ত, লোবো, হাজরি উস্তাদ এবং নন্দবাবুর কাছ থেকে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি যন্ত্র ও বাদনরীতির শিক্ষা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই বহুমুখী শিক্ষাই পরবর্তী আলাউদ্দিন খাঁকে নির্মাণ করে। তিনি বুঝেছিলেন, সঙ্গীত কোনও একক যন্ত্রের বন্দিত্ব নয়। একটি যন্ত্রের সীমা অন্য যন্ত্রের অভিজ্ঞতা দিয়ে অতিক্রম করা যায়; একটি ঘরানার ভাষাকে অন্য ঘরানার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করা যায়। তাঁর সঙ্গীতচিন্তার এই উদারতা পরবর্তী মাইহার ঘরানার অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
সরোদের প্রতি আকৃষ্ট
সরোদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় পরবর্তী সময়ে। মুকতাগাছার জমিদার জগৎকিশোর আচার্যের দরবারে থাকার সময় উস্তাদ আহমদ আলি খাঁর বাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর কাছে তালিম নেন। এরপর তাঁর সঙ্গীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রামপুর। রামপুরে তিনি তানসেনীয় সেনিয়া পরম্পরার বিশিষ্ট সাধক উস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষাই তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। গবেষণায় আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতচর্চাকে ওয়াজির খাঁর সেনিয়া পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি তাঁর বহুগুরু ও বহুযন্ত্রভিত্তিক শিক্ষাকে মাইহার সঙ্গীতের পরবর্তী বৈশিষ্ট্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। এখানেই তাঁর শিল্পীসত্তার একটি আপাত-বিরোধী অথচ অত্যন্ত সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একদিকে তিনি গভীরভাবে ঐতিহ্যনিষ্ঠ; অন্যদিকে সেই ঐতিহ্যকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্গঠন করেছেন। রবিশঙ্করের ভাষায়, এই দুই বৈশিষ্ট্যের যুগল উপস্থিতিই তাঁকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছে।
সঙ্গীত-পরীক্ষাগার
১৯১৮ সালে আলাউদ্দিন খাঁর মাইহারে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে একটি মোড়বদল। মহারাজ ব্রিজনাথ সিংহের দরবারে তিনি সঙ্গীতজ্ঞ ও গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। The Daily Star-এর একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদনেও ১৯১৮ সাল নাগাদ তাঁকে মাইহার দরবারের সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মাইহার তাঁর কাছে কেবল রাজদরবার ছিল না; হয়ে উঠেছিল একটি সঙ্গীত-পরীক্ষাগার। এখানে তিনি ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে বিভিন্ন যন্ত্রের বাদনপ্রযুক্তি, গায়কী-অঙ্গ, লয় ও রচনাশৈলীকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে আধুনিক মাইহার ঘরানা— যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মে এতটাই বিস্তৃত হয় যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ শতকের ইতিহাসকে আলাউদ্দিন খাঁর উত্তরাধিকার ছাড়া সম্পূর্ণভাবে লেখা কঠিন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ তাঁর রাগসৃষ্টিতেও। পত্রিকাটির ২০১৩ সালের একটি বিশদ জীবনীতে হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলি, হেমবেহাগ, মদনমঞ্জরী, মঞ্জ খামাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোষ ও শোভবতী-সহ একাধিক রাগের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও তাঁর সৃষ্ট রাগ নিয়ে সঙ্গীতচর্চা হয়েছে। একটি স্মরণসভায় মঞ্জ খামাজ ও হেমন্ত পরিবেশিত হওয়ার সংবাদে দেখা যায়, আলাউদ্দিন খাঁর সৃষ্ট রাগগুলো তাঁর জন্মভূমিতেও সঙ্গীত-উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে আছে।
পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত-প্রতিষ্ঠান
তবে আলাউদ্দিন খাঁর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি সম্ভবত কোনও রাগ বা বাদ্যযন্ত্র নয়— মানুষ। তাঁর শিষ্যদের দিকে তাকালেই তাঁর গুরুত্ব বোঝা যায়। পুত্র উস্তাদ আলি আকবর খাঁ, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী, জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পন্নালাল ঘোষ, ভি জি যোগ, বাহাদুর খাঁ, শরণ রানি, তিমিরবরণ ভট্টাচার্য-সহ বহু শিল্পী তাঁর শিক্ষায় নিজেদের সঙ্গীতজীবন নির্মাণ করেছেন। ১৯৭২ সালের স্মারক সংখ্যায় Sahapedia-তে সংরক্ষিত The Illustrated Weekly of India-র উপাদানেও তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হিসেবে বিশিষ্ট শিষ্যদের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এখানে একটি গভীর সাংস্কৃতিক সত্য রয়েছে। একজন শিল্পী নিজের প্রতিভায় বড় হতে পারেন; কিন্তু একজন গুরু তখনই ঐতিহাসিক হয়ে ওঠেন, যখন তাঁর শিল্প অন্য মানুষের মধ্যে নতুন শিল্পীসত্তা জন্ম দেয়। আলাউদ্দিন খাঁ সেই অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত-প্রতিষ্ঠান।
পাশ্চাত্য ব্যান্ড-সংগঠনের কাঠামো
রবিশঙ্কর তাঁর গুরু সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁর ‘inspiration’ এবং ভারতীয় সঙ্গীতের গৌরবময় ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সংযোগের সেতু। এই মন্তব্যটি আলাউদ্দিন খাঁর উত্তরাধিকারের প্রকৃতি বোঝার জন্য যথেষ্ট। আলাউদ্দিন খাঁকে শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সংকীর্ণ পরিসরে দেখলে তাঁর সামাজিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। মাইহারে তিনি অনাথ ও দরিদ্র শিশুদের নিয়ে যে ব্যান্ড গড়ে তুলেছিলেন, তা ভারতীয় সঙ্গীত-ইতিহাসের এক অভিনব সামাজিক পরীক্ষা।
বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দলটি ছিল পাশ্চাত্য ব্যান্ড-সংগঠনের কাঠামো এবং ভারতীয় সঙ্গীতচিন্তার এক অভিনব সংলাপ। প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গুরু-শিষ্য ব্যবস্থাকে তিনি যেন দরবারের সীমানা থেকে বের করে সামাজিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁর মাইহার ব্যান্ডের সঙ্গে অনাথ শিশুদের সঙ্গীতশিক্ষার সম্পর্কের উল্লেখ একাধিক ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। এই উদ্যোগের মধ্যে তাঁর সঙ্গীতদর্শনের একটি মানবিক দিক প্রকাশিত হয়— সঙ্গীত কেবল অভিজাত শ্রোতার জন্য নয়; সঙ্গীত মানুষের জীবন বদলানোর শক্তিও রাখে।
পশ্চিমা শ্রোতাদের সামনে
আলাউদ্দিন খাঁর বিশ্বসঙ্গীতে গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে ১৯৩৫ সালের ইউরোপ সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। উদয়শঙ্করের নৃত্যদলের সঙ্গে তিনি ইউরোপে যান এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জটিল ও গভীর ভাষাকে পশ্চিমা শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পান। The Daily Star তাঁকে এ-কারণে পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিচিত করিয়ে দেওয়া প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে তাঁর আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারকে শুধু তাঁর নিজের বিদেশযাত্রায় সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে। প্রকৃত বিস্তার ঘটেছিল তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে। রবিশঙ্করের সেতার, আলি আকবর খাঁর সরোদ এবং মাইহার পরম্পরার অন্যান্য শিল্পীর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পশ্চিমা সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন শ্রোতা পেতে থাকে। এই অর্থে আলাউদ্দিন খাঁ নিজে যতটা আন্তর্জাতিক শিল্পী, তার চেয়েও বেশি তিনি আন্তর্জাতিক সঙ্গীত-পরম্পরার একজন নির্মাতা।
গবেষকের কাছে পৌঁছেছে
বিশ শতকের প্রথমার্ধে সঙ্গীতের প্রচারব্যবস্থা বদলে যাচ্ছিল। রাজদরবারের সীমিত পরিসর থেকে সঙ্গীত বেরিয়ে আসছিল রেডিও, রেকর্ড ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতও এই নতুন মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাঁর জীবন ও সঙ্গীতকে কেন্দ্র করে ঋত্বিক ঘটকের ১৯৬৩ সালের তথ্যচিত্র আজ ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদা পেয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে তাঁর সঙ্গে আলি আকবর খাঁ, অন্নপূর্ণা দেবী, রবিশঙ্কর-সহ তাঁর শিষ্যপরম্পরার সম্পর্কও উঠে আসে। ফলে তাঁর উত্তরাধিকার কেবল শোনা যায়নি; দৃশ্যমানও হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নিজের কণ্ঠে বলা জীবনকথা নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে নিয়োগী বুকস থেকে প্রকাশিত My Life : Story of an Imperfect Musician মূলত ১৯৫২ সালে শান্তিনিকেতনে রেকর্ড করা তাঁর মৌখিক আত্মজীবনীমূলক কথনের ইংরেজি অনুবাদ। বইটির অনুবাদক হেমশ্রী চৌধুরী। প্রকাশকের বর্ণনা অনুযায়ী, এতে তাঁর কঠোর সাধনা, দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম, আধ্যাত্মিকতা, গুরুদের কাছে শিক্ষা এবং সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব দর্শনের প্রত্যক্ষ উপাদান রয়েছে। অর্থাৎ আলাউদ্দিন খাঁ সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখন শুধু শিষ্যদের স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়; তাঁর নিজের কণ্ঠও নতুন প্রজন্মের গবেষকের কাছে পৌঁছেছে।
উত্তর আশাব্যঞ্জক নয়
জন্মভূমি এবং এক বেদনাদায়ক বৈপরীত্য পরিস্থিতিতে এসে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জন্মায়, যে মানুষটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এত বড় উত্তরাধিকার রেখে গেলেন, তাঁর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর কতটা যত্নে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করেছে? উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। The Daily Star ২০০৭ সালে শিবপুরে তাঁর পৈতৃক বাড়ি, পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন এবং সঙ্গীত-ঐতিহ্যের অবহেলার কথা লিখেছিল। ২০১৩ সালের আরেক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, তাঁর বাদ্যযন্ত্র, চিঠিপত্র ও অন্যান্য স্মৃতিবস্তু যথাযথ সংরক্ষণ ছাড়াই পড়ে ছিল। এমনকী তাঁর জন্মভূমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত-কমপ্লেক্স ও জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনাও দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিসর ছিল বহুসাংস্কৃতিক
আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতজীবনের পরিসর ছিল বহুসাংস্কৃতিক। তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ঐতিহ্য গ্রহণ করেছেন, হিন্দু শিষ্যদের গুরু হয়েছেন, দেব-দেবীর নামাঙ্কিত রাগ ও সঙ্গীতপরম্পরার সঙ্গে কাজ করেছেন, আবার নিজ ধর্মীয় পরিচয়ও অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় তাঁকে এমন একজন বাঙালি মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যিনি হিন্দু ও মুসলিম— দুই সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যেই নিজের পেশাগত ও সঙ্গীতিক অবস্থান নির্মাণ করেছিলেন। গবেষণাটি আলাউদ্দিন খাঁর এই সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকে হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই জায়গায় তাঁর জীবন আজকের দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যখন পরিচয়কে ক্রমশ ধর্ম, জাতি, ভাষা ও ভূখণ্ডের খাঁচায় বন্দি করার প্রবণতা বাড়ছে, তখন আলাউদ্দিন খাঁর জীবন যেন অন্য একটি সম্ভাবনার কথা বলে— পরিচয় মানুষকে সীমাবদ্ধ করতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিশীলতা সীমান্ত মানে না।
বহুস্বরের অভিজ্ঞতা
বাংলার শিবপুর থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে রামপুর, রামপুর থেকে মাইহার, মাইহার থেকে ইউরোপ— আলাউদ্দিন খাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রাপথ। এই পথের প্রতিটি পর্বে তিনি কিছু গ্রহণ করেছেন এবং কিছু নতুন সৃষ্টি করেছেন। বাংলার লোকসঙ্গীত তাঁকে দিয়েছে বহুস্বরের অভিজ্ঞতা। কলকাতা দিয়েছে নানা যন্ত্র ও সঙ্গীতধারার সঙ্গে পরিচয়। রামপুর দিয়েছে সেনিয়া ঐতিহ্যের গভীরতা। মাইহার দিয়েছে একটি নতুন সঙ্গীত-পরম্পরা নির্মাণের সুযোগ। আর পশ্চিমা জগৎ দিয়েছে তাঁর এবং তাঁর শিষ্যদের সঙ্গীতকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর পরিসর। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তাই কোনও একক রাগ, কোনও একক বাদ্যযন্ত্র কিংবা কোনও একটি ঘরানা নয়। তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব হল— তিনি ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করে তাকে সৃষ্টিশীল ভবিষ্যতে রূপান্তরিত করেছিলেন। আজ তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তাঁর সাধনার প্রধান ক্ষেত্র ভারতের মাইহার। তাঁর গুরুপরম্পরা রামপুরের সেনিয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর শিষ্যরা ভারতীয় সঙ্গীতকে নিয়ে গেছেন ইউরোপ ও আমেরিকার মঞ্চে। তাঁর সঙ্গীতের শ্রোতা আজ আর কোনও একটি দেশের মানুষ নয়।
জীবন্ত প্রতীক
এই কারণেই আলাউদ্দিন খাঁকে কেবল ভারতীয় বা বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ— কোনও একক পরিচয়ে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক জীবন্ত প্রতীক। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর শরীর থেমে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর সাধনা থামেনি। আজও রবিশঙ্করের সেতারে, আলি আকবর খাঁর সরোদের উত্তরাধিকারে, অন্নপূর্ণা দেবীর সুরবাহারের স্মৃতিতে, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীতচিন্তায় এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য বাদনে তাঁর শিক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তাই আলাউদ্দিন খাঁর মৃত্যু আসলে একজন মানুষের মৃত্যু— কিন্তু একটি সঙ্গীতের নয়। তাঁর সরোদের তার একদিন নীরব হয়েছে; কিন্তু সেই তারের কম্পন এখনও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে ছড়িয়ে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর থেকে মাইহার, মাইহার থেকে বিশ্বমঞ্চ— এই দীর্ঘ যাত্রায় আলাউদ্দিন খাঁ প্রমাণ করে গেছেন, সত্যিকারের সঙ্গীতের কোনও সীমান্ত নেই। আর আজকের বিভাজিত সময়ে তাঁর জীবন আমাদের কাছে শুধু অতীতের গৌরব নয়— একটি প্রয়োজনীয় শিক্ষা। মানুষের জন্ম তাকে একটি ভূগোল দেয়; কিন্তু সাধনা তাকে বিশ্বজনীন করে। আলাউদ্দিন খাঁ সেই বিশ্বজনীনতারই এক বিরল বাঙালি প্রতিমূর্তি।











