ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল প্রেমের দিন। কিন্তু উত্তর কাশ্মীরের হাজিনে তখন ছিল হাড়হিম শীত। ভোরের আলো ফোটার আগেই লস্কর-ই-তৈবার দুই দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে ধরতে জাল বিছিয়েছিল সিআরপিএফ-এর ৪৫তম ব্যাটালিয়ন। আর সেই অপারেশনের একদম সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ভারত মায়ের এক বীর সন্তান—কম্যান্ড্যান্ট চেতন কুমার চিতা।

কিন্তু শত্রু তৈরি ছিল মরণকামড় দিতে। আচমকাই চারদিক থেকে শুরু হলো গুলিবর্ষণ। অন্ধকারের বুক চিরে ধেয়ে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন চেতন। এক, দুই, তিন... করে পরপর ৯টি বুলেট বিঁধল তাঁর শরীরে। একটি গুলি কপাল ফুঁড়ে ঢুকে গেল মাথায়, আরেকটি ডান চোখ নষ্ট করে, হাড় ভেঙে চুরমার করে বেরিয়ে গেল। পেট, কোমর আর দুই হাত নিমেষেই ঝাঁঝরা হয়ে গেল। হাতের ক্ষত এতটাই বিভৎস ছিল যে মাংস উপড়ে বেরিয়ে এসেছিল ভেতরের হাড়।

রক্তাক্ত চেতনকে যখন শ্রীনগর হয়ে দিল্লির এইমস ট্রমা সেন্টারে নিয়ে আসা হল, তখন তিনি গভীর কোমায়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখলেন, তাঁর গ্লাসগো কোমা স্কেল (GCS) স্কোর নেমে দাঁড়িয়েছে 'এম-৩'-তে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এই অবস্থা থেকে কোনো মানুষের বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসকেরা যখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখনও হাল ছাড়েননি চেতনের স্ত্রী উমা সিংহ। উমা বিশ্বাস করতেন তাঁর স্বামী কোমা থেকে ফিরবেই। বিজ্ঞানকে হার মানিয়ে ঠিক দু’মাস পর ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। কোমার অন্ধকার চিরে চোখ মেললেন চেতন। ডাক্তাররা স্তম্ভিত হয়ে একে বললেন 'মিরাকল'। যদিও ডান চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল এবং শরীরজুড়ে ছিল অজস্র সেলাইয়ের দাগ, তবুও চিতা তখনও জীবিত, অপরাজিত।

ভয়াবহ এই ট্রমার পর যেকোনও সাধারণ মানুষ হয়তো অবসর জীবন বেছে নিতেন। কিন্তু চেতন ছিল অন্য ধাতুর তৈরি। শুরু হল আর এক মরণপণ লড়াই—কঠিন ফিজিওথেরাপি। অকেজো হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলোকে সচল করার সেই যুদ্ধেও জিতলেন তিনি। অপারেশনের ঠিক এক বছর পর, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে গায়ে ইউনিফর্ম চড়িয়ে আবার ডিউটিতে ফিরে এলেন কম্যান্ড্যান্ট চেতন চিতা। চোখে আই-প্যাচ আর মুখে সেই চেনা চিতা-র মতো হাসি নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন— "এই ইউনিফর্মটা আমার দ্বিতীয় চামড়া। আমি এটা ছাড়া থাকব কী করে? আমি চাইলে ডিউটি থেকে পালাতে পারতাম, কিন্তু আমি বুলেট ফেস করেছি। আমি চাই দেশের যুবসমাজ দেশের জন্য নিজের ১০০ শতাংশ উজাড় করে দিক।" এই সাহসিকতার জন্য ভারত সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শান্তিকালীন বীরত্ব পুরস্কার 'কীর্তি চক্র'-এ ভূষিত করে।