দেশের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব এস. লক্ষ্মীনারায়ণের (Home Secretary S. Lakshminarayanan) বিস্ফোরক অভিযোগে ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অযোধ্যার রামমন্দির (Ram Mandir)। তাঁর দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে রামলালাকে দান করা প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের, ১৪৭ কেজি ওজনের সোনা-মোড়ানো রামচরিতমানসের কোনও হদিশ মিলছে না। বহুবার মন্দির ট্রাস্টের কাছে জানতে চাইলেও সন্তোষজনক উত্তর বা দানের রসিদ পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এরই মধ্যে বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) তদন্তে রামমন্দিরের প্রণামীর কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত অবিনাশ শুক্লা (Abinash Shukla) সহ একাধিক কর্মীর বিরুদ্ধে নতুন নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এই দুই ঘটনাকে ঘিরে রামমন্দিরে দান, মূল্যবান উপহার সংরক্ষণ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। যদিও উভয় বিষয়েই তদন্ত ও অনুসন্ধান এখনও চলছে।
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব এস. লক্ষ্মীনারায়ণের দাবি, তাঁর পরিবারের এই দান শুধুমাত্র একটি মূল্যবান উপহার নয়, বরং বহু বছরের ধর্মীয় সাধনা ও আবেগের প্রতীক। তাঁর কথায়, প্রয়াত মা জীবনের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে হাতে রাম নাম লিখেছিলেন। সেই স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই তিনি ও তাঁর স্ত্রী সরস্বতী একটি বিশেষ রামচরিতমানস নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৪৭ কেজি ওজনের এই গ্রন্থে রামচরিতমানসের ১০,৯০২টি শ্লোক খোদাই করা ছিল এবং ৫২২টি পৃষ্ঠায় খাঁটি সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। যার আনুমানিক মূল্য ধরা হয় সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা।
এস. লক্ষ্মীনারায়ণের অভিযোগ, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের হাতে এই রামচরিতমানস তুলে দেন। সে সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল, এটি রামলালার গর্ভগৃহে সংরক্ষণ করা হবে। প্রথমদিকে গ্রন্থটি সেখানে রাখা হয়েছে বলে ছবি পাঠানো হলেও, পরে সেটি আর দেখা যায়নি। এরপর বহুবার ট্রাস্টের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলেও উপহারটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, সেই বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য তাঁকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এস. লক্ষ্মীনারায়ণের অভিযোগ, রামমন্দিরে এই মূল্যবান উপহার জমা দেওয়ার সময় ট্রাস্টের পক্ষ থেকে তাঁকে কোনও রসিদ দেওয়া হয়নি। এরপর বিষয়টি জানতে তিনি একাধিকবার অযোধ্যায় (Ayodhya) যান এবং চম্পত রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর দাবি, প্রথমবার প্রায় ৯ ঘণ্টা এবং দ্বিতীয়বার ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কেবল রসিদ দেওয়ার আশ্বাসই মিলেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু রসিদই নয়, কোটি টাকার ওই সোনা-মোড়ানো রামচরিতমানস বর্তমানে কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, সে সম্পর্কেও ট্রাস্টের কাছ থেকে কোনও স্পষ্ট তথ্য পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পরে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও এখনও পর্যন্ত বিষয়টির কোনও নিষ্পত্তি হয়নি বলেও তাঁর দাবি।
অন্যদিকে, রামমন্দিরের প্রণামীর অর্থ আত্মসাতের তদন্তেও একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) তদন্তে অভিযোগ, গত দু'বছরে কয়েক কোটি টাকার প্রণামী আত্মসাৎ হয়েছে। এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত অবিনাশ শুক্লা, লবকুশ মিশ্র, রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নুসহ একাধিক কর্মীর সম্পত্তি, আর্থিক লেনদেন এবং আয়ের উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, মাসে ১৪-১৫ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কয়েকজন কর্মী অল্প সময়ের মধ্যেই বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি এবং জমির মালিক হয়ে ওঠেন।
তদন্তকারীদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রণামীর অর্থ আত্মসাৎ করা হতো। নজরদারি কড়া হওয়ার পর ব্যাঙ্কে জমা পড়া অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অনিয়মের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজন কর্মীর সন্দেহজনক গতিবিধিও ধরা পড়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। অভিযোগ, নগদ অর্থ ও সোনা-রুপোর দানসামগ্রী গোপনে মন্দিরের বাইরে পাচার করা হতো। তদন্তে মন্দির পরিচালনাকারী শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের কয়েকজন পদাধিকারীর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় ও ট্রাস্টি অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। তবে প্রণামীর অর্থ আত্মসাৎ এবং মূল্যবান দানসামগ্রী সংক্রান্ত উভয় অভিযোগের তদন্ত এখনও চলছে।
















