যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে (Jadavpur University) ঘিরে বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। দেওয়াল লিখন মোছা থেকে শুরু করে ‘বন্দে মাতরম’ যাত্রা—একাধিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবারও উত্তপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। একদিকে এবিভিপির জাতীয়তাবাদী কর্মসূচি, অন্যদিকে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে এসএফআইয়ের পালটা মিছিল। এরই মধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখন মোছাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ (Trinamool leader Kunal Ghosh)।

সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে  রাতের অন্ধকারে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে বেশ কিছু দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়া হয়েছে। সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে কার্ল মার্ক্সের (Karl Marx) উক্তি এবং বিভিন্ন স্লোগান। মাঝরাতে বিষয়টি জানতে পারেন পড়ুয়ারা। তবে সেই সময়ে হস্টেলের বাইরে বেরোতে পারেননি তাঁরা। অভিযোগ, দেওয়াল মোছার কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরই বিষয়টি পড়ুয়াদের নজরে আসে। এর আগেও চুনকাম করে চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের একটি ছবি মুছে ফেলা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের সময়কার মানুষের দুর্দশার ছবি আঁকার জন্য পরিচিত চিত্তপ্রসাদের সেই ছবি মুছে ফেলার ঘটনায় সমাজমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। অনেকেই বিষয়টিকে বাঙালির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনার উপর আঘাত হিসেবে দেখেছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে দেওয়াল লিখন মোছার অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, যাদবপুরের পড়ুয়াদের নিজেদের বক্তব্য ও স্লোগান দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে কোনও স্লোগানকে ‘দেশবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করা হলে তিনি তার বিরোধিতা করেন। তাঁর কথায়, ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’-র মতো স্লোগান তাঁরা সমর্থন করেন না। কিন্তু সেই কারণে ক্যাম্পাসের সমস্ত দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়া বা পড়ুয়াদের লেখার অধিকার বন্ধ করে দেওয়া যায় না। ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান প্রসঙ্গেও কুণাল বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয় এবং এর সঙ্গে সরাসরি ভারত-বিরোধিতার সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, যাদবপুরে পড়ুয়াদের উপর আক্রমণ বা আগুন লাগানোর মতো ঘটনাও রাতের অন্ধকারেই ঘটছে। তাঁর কটাক্ষ, বর্তমান সরকার ‘জঙ্গলরাজ’ নয়, ‘নিশাচরের সরকারে’ পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে   যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে পাল্টা জাতীয়তাবাদী কর্মসূচি নেয় এবিভিপি। ‘হরিপদ ভারতী স্মৃতিরক্ষা সমিতি’র উদ্যোগে এ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন অডিটোরিয়ামে জাতীয়তাবাদী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। তার আগে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘বন্দে মাতরম’ যাত্রা করে এবিভিপি।
মিছিল থেকে ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান ওঠে। এবিভিপির দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কোনও ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না। বিতর্কিত দেওয়াল লিখনের পালটা হিসেবে দেশের বিশিষ্ট মনীষীদের ছবি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি লাগানোর পাশাপাশি চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর সংবিধানে অঙ্কিত ছবিও দেওয়ালে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে এবিভিপির এই কর্মসূচির পালটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে মিছিল করে এসএফআই। দুই মিছিলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক এবং শিক্ষাকর্মীদের একাংশ অংশ নেন। দুই পক্ষের কর্মীরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ তোলেন।

উল্লেখ্য, গত দু’সপ্তাহ ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সেই ঘটনার আঁচ পড়েছে রাজ্য রাজনীতিতেও। গত সপ্তাহে যাদবপুরে ১০ হাজার কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন। এবার তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবিভিপির ‘বন্দে মাতরম’ যাত্রা এবং জাতীয়তাবাদী সম্মেলন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। দেওয়াল লিখন নিয়ে অবশ্য সরাসরি কোনও পক্ষের হয়ে অবস্থান না নিয়ে আলাদা বার্তা দিয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, “দেওয়ালে লিখলে নাম, সে নাম মুছে যাবে। হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে।” যাদবপুরের সব পক্ষকে বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি ও আবহাওয়া বুঝে বাংলার মানুষের মনে নাম লেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।