বিয়ের বয়স তখন সবে ১৫ দিন। আচমকাই হৃদরোগে মৃত্যু হল স্বামীর। একদিকে সদ্যবিবাহিত জীবনের শোক, অন্যদিকে কোলজুড়ে সন্তান আসার খবর। মাত্র ২০ বছর বয়সে স্বামীহারা পেচিয়াম্মালের (Pechiammal) সামনে তখন একটাই প্রশ্ন কী ভাবে একা সন্তানকে নিয়ে বাঁচবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি, তা বদলে দিয়েছিল তাঁর গোটা জীবন। নিজের পরিচয়, পোশাক, এমনকি নামও বদলে ফেলেছিলেন পেচিয়াম্মাল। প্রায় ৩৭ বছর ধরে পুরুষের পরিচয়ে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। তামিলনাড়ুর একটি ছোট্ট গ্রামে তাঁকে সকলে চিনতেন ‘মুথু মাস্টার’ (Muthu Master) নামে।
সাদা জামা, ধুতি, ছোট করে কাটা চুল—বাহ্যিক চেহারায় তাঁকে পুরুষ বলেই মনে করতেন গ্রামের মানুষ। কাজকর্মেও নিজেকে সেভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ‘মুথু মাস্টার’-এর আড়ালে ছিলেন পেচিয়াম্মাল—এক মা, যিনি মেয়েকে মানুষ করার জন্য নিজের পরিচয়কেই বিসর্জন দিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর পেচিয়াম্মাল একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। সংসার চালাতে থুথুকুডির (Thoothukudi) একটি কয়লার কারখানায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানেই ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একদিন কাজের পথে এক ট্রাকচালক তাঁকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। কোনওরকমে সেখান থেকে নিজেকে রক্ষা করেন পেচিয়াম্মাল। সেই ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে তাঁর মনে। উপলব্ধি করেন, একা একজন মহিলার পক্ষে সমাজে নিজের এবং সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা কঠিন। এর পরেই পুরুষের পরিচয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একটি জামা ও ধুতি কিনে তিরুচেন্দুরে যান পেচিয়াম্মাল। সেখানে মাথা কামিয়ে পুরুষের পোশাক পরেন। সেই দিন থেকেই যেন তাঁর জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। পেচিয়াম্মাল হয়ে ওঠেন ‘মুথু’। পরে একটি খাবারের দোকানে রান্নার কাজ করার সময় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মাস্টার’ নামটিও। মেয়েকে নিয়ে কট্টুনাইক্কানপট্টি গ্রামে (Kottunaikkanpatti Village) চলে যান তিনি। সেখানে নতুন পরিচয়েই শুরু হয় তাঁর জীবন। গ্রামের মানুষ তাঁকে পুরুষ হিসেবেই জানতেন। মাঠে কাজ করে ধীরে ধীরে সকলের বিশ্বাস অর্জন করেন। এমনকি মেয়েকেও দীর্ঘদিন মায়ের আসল পরিচয় গোপন রাখতে হয়েছিল।
নিজের পরিচয় যাতে কোনও ভাবেই প্রকাশ না পায়, সে জন্য দৈনন্দিন জীবনেও নানা কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি পুরুষের চেহারা ও আচরণকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিড়িও ধরতেন। তাঁর কথায়, অনেক সময় সেই বিড়িই তাঁকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। এক রাতে এক মাতাল ব্যক্তি তাঁর কাছে এসেছিলেন। মুথুকে পুরুষ ভেবেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেন ওই ব্যক্তি। মুথু বিড়ি ধরাতেই তাঁর সন্দেহ আরও দূর হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে চলে যান ওই ব্যক্তি। তবে এই পরিচয় কোনও দিনই তাঁর কাছে শখের বিষয় ছিল না। ছিল নিরাপত্তার উপায়, আত্মসম্মান রক্ষার ঢাল এবং মেয়েকে বড় করে তোলার লড়াই। নারীর স্বাভাবিক জীবনের বহু অভিজ্ঞতাও তাঁকে এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে সামলাতে হয়েছে। ঋতুস্রাবের সময়ও ব্যথা ও শারীরিক অসুবিধা নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হত, যাতে তাঁর পরিচয় প্রকাশ না পায়। সময়ের সঙ্গে মেয়ের জীবনও স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু এত বছর পরেও নিজের পুরনো পরিচয়ে ফিরে যেতে চান না মুথু। কারণ, তাঁর কাছে ‘মুথু’ শুধুমাত্র একটি নাম নয়—এটি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মরক্ষা এবং মাতৃত্বের প্রতীক। যে সমাজে নিরাপদে বাঁচার জন্য এক নারীকে নিজের পরিচয় পর্যন্ত বদলে ফেলতে হয়েছিল, সেখানে পেচিয়াম্মালের গল্প শুধুই ছদ্মবেশের গল্প নয়। এটি এক মায়ের অসীম সাহস, আত্মসম্মান এবং সন্তানকে আগলে রাখার অদম্য লড়াইয়ের গল্প। প্রায় চার দশক ধরে যে পরিচয় তাঁকে বাঁচতে শিখিয়েছে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই ‘মুথু’ হয়েই থাকতে চান পেচিয়াম্মাল।
















