আজকের কলকাতা কি আগামী দিনের কলকাতার (Kolkata) মতোই থাকবে? প্রশ্নটা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো (Elnino), অন্যদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে দ্রুত বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আবহাওয়া থেকে জনজীবন, উপকূলীয় এলাকা থেকে বড় শহরের পরিকাঠামোয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-র পূর্বাভাস, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ‘ভেরি স্ট্রং’ (Very Strong) পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি (February) পর্যন্ত তার প্রভাব জোরালো থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর প্রভাব যে শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (Pacific region) সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলে বদলে যায় বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিও। তার প্রভাব পড়ে বিশ্বের নানা দেশের বৃষ্টি ও তাপমাত্রার (Temperature) উপর। কোথাও অতিবৃষ্টি এবং বন্যা, আবার কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি, খরা বা তীব্র গরম দেখা দিতে পারে। ভারতও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়। ফলে চলতি বছর ভাল বৃষ্টি হয়েছে বলে আগামী মাসগুলিতে পরিস্থিতি একই থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তবে এল নিনোর চেয়েও বড় চিন্তার কারণ দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জল ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রের কাছাকাছি নিচু শহরগুলির ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মুম্বই (Mumbai), ঢাকা (Dhaka) এবং কলকাতার মতো শহরগুলিও সেই তালিকায় রয়েছে। আগামী কয়েক দশকে সমুদ্রের জলস্তর আরও বাড়লে এই শহরগুলির একাংশে বসবাস ও পরিকাঠামো টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ (Challenge) হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে জুড়ছে আরও একটি আশঙ্কা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের বাসস্থান বদল। উপকূলীয় এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠলে বহু মানুষ নিরাপদ জায়গার সন্ধানে বড় শহরের দিকে চলে আসতে পারেন। এই ঘটনাকেই বলা হয় ‘ক্লাইমেট ইনডিউসড হিউম্যান ডিসপ্লেসমেন্ট’ (Climate-induced human displacement)। কলকাতার দিকে এমন জনস্রোত তৈরি হলে আবাসনের চাহিদা বাড়বে, একই সঙ্গে চাপ পড়বে জল, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের উপর।

শুধু শহরের পরিকাঠামো নয়, বদলে যেতে পারে কলকাতার জীবনযাত্রার ছবিও। সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়া, ভারী বৃষ্টি, জল জমা বা বন্যার ঝুঁকি সামলাতে আগামী দিনে শহরের নিকাশি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ এবং বসতি পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। যাঁরা এখন কলকাতায় নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাঁদের কাছেও তাই প্রশ্ন ২০৫০ সালে এই শহর কি আজকের মতোই থাকবে?

এল নিনো কয়েক মাসের আবহাওয়ায় বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সমস্যা আরও দীর্ঘমেয়াদি। তাই কলকাতাকে আগামী দিনের জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত করার প্রয়োজন রয়েছে। নইলে আজকের সতর্কবার্তাই আগামী দিনে শহরের বাস্তব সঙ্কটে পরিণত হতে পারে।