যে কোনো শিল্পের ক্ষেত্রেই উৎকর্ষের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছোনোর গবেষণা অন্তহীন। পরীক্ষা নিরীক্ষা বিরামহীন। 

ফুটবল খেলাটা যাতে আরও উত্তেজক, আরও চিত্তাকর্ষক এবং আরও সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠে তার জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মগজ নিয়োজিত , সদাব্যস্ত। তাঁরা সকলেই পেশাদার। ফুটবল তাঁদের অন্নদাতা, ঈশ্বর। তাঁদের আর কোনো কাজ নেই। তাঁরা ফুটবল ছাড়া আর কিছু জানেন না। এও এক গান্ধর্ব বিদ্যা। " Even best can be bettered " কথাটা এঁদের কাছে পাখির চোখের মতো। আরো ভালো, আরও ভালো, আরও আরও ভালো ছাড়া এঁরা অন্য কিছু ভাবেন না। এটাই এঁদের দর্শন, সাধনা।

স্প্যানিশ ফুটবল কোচ দে লা ফুয়েন্তে এবং তাঁর ছাত্র আর্জেন্টিনার কোচ লিও স্কালোনি ফুটবল ছাড়া আর কিছু জানেন না, বোঝেন না। এঁরা দুজনেই ফুটবলের ভিতর দিয়েই দেখেন ভুবনখানি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আমরা দেখলাম ধুরন্ধর গুরু শিষ্যের মগজের লড়াই, কৌশলের যুদ্ধ। ছাত্র স্কালোনি এ লড়াইয়ে ডাহা ফেল ! 

তাহলে এতদিন ধরে ছাত্রকে কী শেখালেন গুরু ? গুরুমারা বিদ্যেই যদি দখলে না এলো তাহলে শিক্ষা তো সম্পূর্ণ হলো না ! 

স্কালোনির মেসিনির্ভর দল সম্মোহিতের মতো, চিত্রার্পিতের মতো বিহ্বল হয়ে দে লা ফুয়েন্তের দুরন্ত স্প্যানিশ ঝড় দেখতে লাগলো! স্পেন যখন গোলে শট নিলো ২০ খানা, তখন আর্জেন্টিনা মাত্র ২ টো ! আর্জেন্টিনা ফাউল করলো ২৪ টা, হলুদ কার্ড দেখলো ৫ টা , লাল কার্ড দেখলো ১ টা, তাও আবার এমন সময়ে, যখন দলের একেবারে পর্যুদস্ত অবস্থা,

বল পজেশনেও অনেক পিছিয়ে তারা। জঘন্য ফুটবল। কোনো বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমণ নেই , সেটপিস মুভ তো সবকটা ফ্লপ! মেসি প্রায় বোতলবন্দী। স্পেনের গতিময় ফুটবলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারলো না আর্জেন্টিনা। এমন একপেশে বিশ্বকাপ ফাইনাল আগে কখনও দেখা গেছে কি ? মেসিদের সৌভাগ্য তারা ৫ গোল খায় নি। পাঁচ গোলের বেশিও হতে পারতো। কিন্তু কেন এমন হলো ? 

আসলে আর্জেন্টিনা নিজেদের ভাঙতে পারে নি , সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বদলাতে পারে নি। নানা ভাঙনের মধ্যে দিয়ে, বহুবিধ বদলের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়। কিন্তু বর্তমান আর্জেন্টিনা দল কোথাও যেন আত্মতৃপ্ত হয়ে পড়েছিল। হয়তো বা ভেবেছিল এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না। পক্ষান্তরে দে লা ফুয়েন্তের স্পেন নিজেদেরকেই বারবার ভাঙতে ভাঙতে, নিজেদের পুরোনো সিস্টেম এবং প্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণাগুলোকে দলবদ্ধভাবে ভেঙে তছনছ করতে করতে এগোচ্ছিল দুর্বার গতিতে। প্রতি মুহূর্তে নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবনে তারা সময় দিয়েছে বিস্তর। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, সেটা দেখতে পায় নি, জানতে পারে নি দিদিয়ের দেশঁর ফ্রান্সও । 

তাহলে অন্য দেশগুলোর চেয়ে কোথায় অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে স্পেন ? ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালটা যাঁরা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই অন্য দেশগুলোর সঙ্গে স্পেনের তফাতটা বুঝবেন। না বুঝলে ফাইনাল ম্যাচের রিপ্লে দেখতে পারেন কয়েকবার। 

কী দেখা গেলো ?  স্পেনের যে বিখ্যাত তিকিতাকা ম্যাজিক তাদের প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলো , তা থেকে অনেক যোজন এগিয়ে গেছে আজকের স্প্যানিশ ফুটবল। এখন আর একটানা-একঘেয়ে- বিরামহীন তিকিতাকা নয়, এখন যথেষ্ট পরিমিত তিকিতাকা, যখন যেখানে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু। তারপর ? এর সঙ্গে নতুন আর কি কি যোগ হলো ? 

মনে রাখতে হবে এই তিকিতাকা আগের মতো মন্থর নয়, যথেষ্ট গতিময়। তিকিতাকা খেলতে খেলতে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে একেবারে ঝড়ের গতিতে বিপক্ষের গোলমুখে পৌঁছে মাত্র একটা কি দুটো অনবদ্য পাস খেলে বারবার প্রতিপক্ষের গোলমুখ খুলে ফেলার কোনো জবাব নেই ! ওই দুরন্ত গতিতে ওয়ান-টাচ দেখতে হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া যায়। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে রাইনাস মিশেল ও জোহান ক্রুয়েফের টোটাল ফুটবলের কিছু মির্চ মশলা! 

এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক কোচ ফুয়েন্তে। " নিজেদের তৈরি করা সিস্টেম নিজেরাই ভাঙো, নিত্যনতুন অভিনব সব কৌশল উদ্ভাবন করো, ধারাবাহিক বদলের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকো প্রতিনিয়ত, কোনো নির্দিষ্ট সিস্টেমের ভারবাহী গাধা হয়ে পড়া চলবে না, তাই ভাঙনের জয়গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলো " ,

মূলত এই হলো দে লা ফুয়েন্তের ফুটবল দর্শন।স্পেনের ফুটবল পরিকাঠামোর অন্যতম সেরা ফসল হলো অসংখ্য পেশাদার কোচ তৈরি করা।

এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা পেশাদার কোচ উৎপাদক দেশ স্পেন। দে লা ফুয়েন্তের অত্যাধুনিক ফুটবল দর্শনকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করলেন তাঁর সেরা ছাত্রেরা। ইয়ামাল, রড্রি, ওলমো, পেদ্রি, তোরেস, লাপর্তে প্রমুখ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাবানলের গতিতে প্রতিপক্ষকে ছারখার করেছে এই বিশ্বকাপে । কে রুখবে এই স্পেনকে ?