এই এক ছবি দেখি,
দিনরাত দুর্বোধ্য আয়নায় 
বিকেলের মতো এক ক্লান্ত নারী রহস্য বিতরে ;
কিংবা আমাদের মন আছে কিনা, অস্ফুট বার্তায় প্রশ্ন শুনি যেন ; কিংবা যতটুকু এ হৃদয়ে ধরে 
ততটুকু নিতে গিয়ে 
দেখি ছবি অগাধ গভীর 
কোথায় যে নিয়ে যায় ? 
তারপর সকলি নিবিড় 
চেতনা চেতনা শুধু ! এক ছবি বহু হয় তখন কি ? 
তখনো কি নিরুত্তর কিছু প্রশ্ন থাকে ? 
পৃথিবীর সব নিয়ে, তবু যেন সব পাওয়া নয় 
এমনই অভাব ? ...
( পিকাসোর জন্য ,
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় )

আহা, সেই বৃদ্ধ পথগায়ক, সেই গিটার জাপটে গিটারের দেহেই যেন মিশে যেতে চান, পিকাসোর সেই বৃদ্ধ স্প্যানিশ-বাদক বড়ো ভাঙাচোরা, প্রকৃত অর্থেই জরাজীর্ণ, এখনও কি আর পথেঘাটে পড়ে থাকা তাঁর শোভা পায় ? 
আর ক্ষমতা নেই তাঁর,
এ ভাঙা শরীর একটু বিশ্রাম চায় এবার।
কিন্তু অবকাশের ফুরসত কোথায় ? বিছানায় গা এলিয়ে দিলে কে তাঁকে রুটি জোগায় এই জীবনসন্ধ্যায়? বাধার পাহাড় ঠেলতে ঠেলতে সব ঘাম ঝরে গেছে তাঁর। সব রক্ত শুষে নিয়েছে জীবনের নিকষ আঁধার। হাড়ে তার টান লেগেছে সেই কবেকার প্রাচীন খাঁচায় । সবটুকু শক্তি নিঃশেষিত হয়েও এখনও আছেন তিনি কিছু সুর অন্তরে রয়ে গেছে বলে। সেটুকুও ঝরে গেলে কোনো একদিন তিনি পড়ে থাকবেন কোনো এক পথের ধারে। স্থবিরতা এখনও আসেনি বলেই আজও থামেনি তাঁর বাজনার হাত। আসলে তো সুর নয়, পথে তাঁর নেমে আসা পেটের তাগিদে। সেই খিদে, সেই আদি অনন্ত ক্ষুধা, যার বিনিময়ে প্রিয়ার চোখের মণি পর্যন্ত দিতে রাজি থাকেন কবি। 

জানতে বড়ো সাধ জাগে, জি-মাইনর থেকে এফ-শার্প মেজর অবধি সুদীর্ঘ যাত্রা কেমন লাগলো তাঁর! তার থেকে তারে, কর্ড থেকে কর্ডে ঘুরে ঘুরে ঘষে ঘষে এই যে জীর্ণ হয়ে এলো তাঁর হাতের আঙুলগুলো, সেখানে কি কোনো  আনন্দস্মৃতি নেই ? শুধুই কি কোমল ধৈবতের বিষাদ ? কোমল নিষাদের হাহাকার ? বৃদ্ধ স্প্যানিশ-বাদকের সারাটা জীবন জুড়ে কেবলই কি কড়ি- মধ্যম ?  এটা কি একটা জীবন , বেঁচে থাকা ? তাই এ ছবি কোনো গভীর ধ্যানমগ্নতার নিবিড় চিত্রায়ণ নয়। এ গূঢ় বৃত্তান্ত জানতে চাইলে যেতে হয় মহামতি পাবলো পিকাসোর দরবারে , গিটার হাতে নিভে আসা মানুষটিকে যিনি দিয়ে গেছেন অনন্ত পরমায়ু।

' দ্য ওল্ড গিটারিস্ট ' সৃষ্টি করার সময় কেমন ছিলেন পাবলো পিকাসো ? আনন্দে ভাসমান ? নাকি মানসিক চাপে কিছুটা বিপর্যস্ত ? কোন খেপা হাওয়া ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলো পিকাসোর মরমী মনটাকে ? তিনি কি তখন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আঁধার সমুদ্রে অসহায়, দিশেহারা বোধ করছিলেন ? হয়তো বা ভাবছিলেন, ' মায়া তরঙ্গে টলোমলো তরণী, অকুল ভবপারাবার... ' ।
এবার সাদা চোখে দেখা যাক ছবিটি আবার। 
' দ্য ওল্ড গিটারিস্ট ' 
( The Old Guitarist ) তৈলচিত্রটি স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো এঁকেছিলেন ১৯০৩ সালের শেষ থেকে ১৯০৪ সালের শুরুর দিকে , যখন পিকাসো ছিলেন বার্সেলোনায় । এটি পিকাসোর ব্লু-পিরিয়ড বা নীল যুগের ( ১৯০১- ১৯০৪ ) একটি অসামান্য সৃজন। পিকাসোর জীবনের এই সময়টি চরম আর্থিক দুর্দশা ও গভীর বিষন্নতায় কেটেছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যাসেজমাসের 
আত্মহননের প্রভাবও যেন ' দ্য ওল্ড গিটারিস্ট ' ছবির বিষাদের মধ্যে স্পষ্ট। ছবিতে প্রধানত একরঙা একঘেয়ে ঠাণ্ডা নীল ও তার বিভিন্ন আভা ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিঃসীম নিঃসঙ্গতা ও বিপুল বিমর্ষতার প্রতীক। জীর্ণ, অতি দুর্বল এক বৃদ্ধ বসে আছেন গিটার হাতে। তিনি অন্ধ। এই মানুষটির শরীরকে কিছুটা লম্বা ও কৌনিক রূপ দেওয়া হয়েছে এল গ্রেকো  ( El Greco , ষোড়শ শতকের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। সমাজের নিচুতলার, বিশেষ করে দুর্বল ও উপেক্ষিতদের প্রতি গভীর সহানুভূতিশীল ছিলেন পিকাসো । তারই বহিঃপ্রকাশ এই কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি।

এক অবহেলিত শিল্পীর আত্মিক সংগ্রাম এবং দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও সঙ্গীতের মাধ্যমে বেঁচে থাকার আকুতি ফুটে উঠেছে এই ছবিতে। বর্তমানে এই মাস্টারপিস চিত্রকর্মটি আমেরিকার শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত রয়েছে।  ছেঁড়া, জীর্ণ পোশাক পরিহিত এক দরিদ্র, অন্ধ, বৃদ্ধ পথগায়ক স্পেনের বার্সেলোনার কোনো একটি রাস্তার ধারে গিটার আঁকড়ে বসে আছেন। সম্ভবত গানও গাইছেন কিছু উপার্জনের আশায়। এই মর্মস্পর্শী তৈলচিত্র যিনি সৃষ্টি করতে পারেন তাঁর মরমী মন নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। বরং তাঁর সংবেদনা সীমাহীন। বিপন্ন মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ব তাঁর সমকাল এবং ভাবীকালের জন্য এমন এক মানবিক বার্তা রেখে যায়, যার প্রাসঙ্গিকতা অফুরান। যে ক্যানভাসের ওপর গিটার হাতে প্রায় কঙ্কালসার মানুষটির ছবি এঁকেছিলেন পিকাসো, আধুনিক এক্স-র প্রযুক্তির মাধ্যমে জানা যায়, সেই ক্যানভাসের ঠিক নিচে পিকাসোর আঁকা অন্য একটি ছবি ( এক তরুণী মায়ের প্রতিকৃতি ) ছিল, যা অর্থাভাব বা ক্যানভাসের দাম বাঁচানোর জন্য তার ওপরেই নতুন করে এই ' দ্য ওল্ড গিটারিস্ট ' ছবিটি তাঁকে আঁকতে হয়।  ওহ্ , কি সব মাথা খারাপ করা ছবি এঁকে তুমি চলে গেছো পিকাসো, যা দেখে আমরা আজও স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে যাই ! আজ ১২২ বছর পরেও আমাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না।