আকাশ যখন চক্ষু বোজে
অন্ধকারের শোকে
তখন যেমন সবাই খোঁজে
সুচিত্রা মিত্রকে,
'তিনি সুচিত্রা', উৎপল সিনহার কলম
Sponsored

তেমন আবার কাটলে আঁধার
সূর্য উঠলে ফের
আমরা সবাই খোঁজ করি
কার ?
সুচিত্রা মিত্রের।
( নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী )
মনে রাখতে হবে তিনি শুধুমাত্র বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী নন । তাঁর আরেকটি বিশেষ পরিচয় তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক গণশিল্পী।
এক উত্তাল সময়ের অকুতোভয় অগ্নিকন্যা।
এক আগুনঝরা ইতিহাসের উজ্জ্বল প্রতিনিধি। নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই আন্দোলনে মাঠে ময়দানে রাজপথে বারবার সামিল হয়েছেন এই মরমী শিল্পী। দুর্গত, বিপন্ন, দরিদ্র মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অজস্রবার, মাথা উঁচু করে সোচ্চারে গেয়েছেন প্রতিবাদ প্রতিরোধের গান। গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে একজন অগ্রণী কর্মী হিসেবে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। যুগের ডাকে ইতিহাসের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন বারবার। শিল্পীসুলভ অহমিকা নিয়ে বসে থাকেন নি ঘরের কোনে। সমকালের ডাকে বধির হয়ে থাকেন নি। তাই শিল্পী হিসেবে সুচিত্রা মিত্রের মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সংবেদনশীল প্রতিবাদী জীবনের উল্লেখ করতেই হয়।
অসামান্য রূপসী, সুমার্জিত, ঋজুবাক, ব্যক্তিত্বময়ী এই বহুমুখী প্রতিভার উজ্জ্বল উপস্থিতি যে কোনো অনুষ্ঠানে আশ্চর্য এক প্রাণ সঞ্চার করতো । এক অভিজাত কান্তিময় আলো তাঁকে যেন ঘিরে থাকতো। তিনি ছিলেন একাধারে সুগায়িকা, শিক্ষিকা, সুলেখিকা, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী, সুবক্তা ও চিন্তক। দেশ- কাল ও সমাজ নিয়ে তাঁর ভাবনা তিনি কখনও লুকোতেন না। স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করেই বলতেন। তাঁর গণনাট্য জীবনের স্বর্ণময় উপলব্ধি পরবর্তীতে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনাকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে ।
শিল্পী ও শিক্ষিকা সুচিত্রা মিত্র ছিলেন স্বয়ং এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। রবীন্দ্র গানের ক্ষেত্রেও তিনি যেন এক অনন্য ঘরানা । রবীন্দ্রনাথের দর্শন না বুঝলে রবীন্দ্রসঙ্গীত পূর্ণতা পেতে পারে না এমনই বিশ্বাস ছিল তাঁর।
তাঁর লেখা ' রবীন্দ্রসঙ্গীত জিজ্ঞাসা ' সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের অবশ্যপাঠ্য। এই বইটি রবীন্দ্র চর্চার এক মহামূল্যবান দলিল হিসেবে থেকে যাবে বহুকাল। সেখানে একটি অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন শ্রোতাদের হৃদয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পৌঁছে দিতে হলে সবচেয়ে আগে আবিষ্কার করতে হবে নির্দিষ্ট গানটির লয়, অর্থাৎ গানটি এগোতে থাকবে কেমন গতিতে। কারণ, গানের লয়ের মধ্যেই নিহিত থাকে গানের প্রাণ। মধ্য লয় , ঢিমে লয় , দ্রুত লয় ইত্যাদি বললে তেমন ভালো বোঝানো যায় না। গানের স্থায়ী অংশ বারবার গেয়েও যদি লয় নির্ধারণ করা না যায়, তখন আরও একটি পথ অনুসরণ করা যেতে পারে।
তিনি নিজে সেই পথে গিয়ে অনেক সময় গানের আসল লয় খুঁজে পেয়েছেন। সেই পথটি হলো, অন্তরা অংশটি বারবার গাওয়া। অন্তরা গাইতে গাইতে নির্দিষ্ট গানের যথাযথ লয়টি খুঁজে পাওয়া যেতেই পারে। এ এক অভিনব শিক্ষা। স্পষ্ট উচ্চারণে যথাযথ স্বরক্ষেপণ, স্বরলিপি মেনে সুরের ওঠানামা বুঝে নেওয়া, মীড়ের সঠিক রূপায়ণ এবং সর্বোপরি গানের মূল বার্তা অর্থাৎ দর্শনটি ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে পারলে তবেই রবীন্দ্র সংগীত উৎকর্ষের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাতে পারে । যথাযথ অভিব্যক্তি প্রকাশ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সুচিত্রা মিত্রের গান নিয়ে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, " রবীন্দ্রনাথের গানে সেরা হচ্ছে সুচিত্রা...
সে বেশ গলা ছেড়ে গায়... এর মধ্যে কোনো গোঁজামিল নেই... তার সাবলীলতা... সে এক দেখার এবং শোনার জিনিস। তার ছন্দজ্ঞান অসামান্য... সুচিত্রা নিখুঁত।
মনে হয় দীনেন্দ্রনাথ বুঝি ফিরে এলেন " ।
গান সত্যিই প্রাণ পেতো, মূর্ত হয়ে উঠতো তাঁর দীপ্ত কণ্ঠে। তাই বুঝি তিনি রবীন্দ্র গানের অতুলনীয় প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন।
১৯৪৫ সালে তাঁর প্রথম রবীন্দ্র গানের রেকর্ড বের হয়। তখন তিনি মাত্র একুশ। রেকর্ডের একপিঠে ছিল ' মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান ' , অন্যপিঠে ছিল ' হদয়ের একুল ওকুল দু'কুল ভেসে যায় ' ।
এরপর সারাজীবনে তাঁর সাড়ে চারশোরও বেশি রবীন্দ্র সঙ্গীতের রেকর্ড বেরিয়েছে। রবীন্দ্র গান ছাড়াও তাঁর গলায় প্রাণ পেয়েছে অতুলপ্রসাদের গান, ব্রক্ষ্মসঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান এবং হিন্দি ভজন।
সুচিত্রা মিত্রের জন্ম হয়েছিল চলন্ত ট্রেনের কামরায়। তাই বুঝি তাঁর সারাটি জীবন ছিল এক আশ্চর্য গতিময়তার ছন্দে গাঁথা। তাঁর বাড়িতে ছিল সঙ্গীতের নিবিড় আবহ। তাঁর মায়ের গলায় ' সন্ধ্যা হলো গো ও মা ' গানটি শুনে বালিকা সুচিত্রার চোখ ভিজে যেতো। তাঁর গুরু ও শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন অমিতা সেন, অনাদি কুমার দস্তিদার, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শান্তিদেব ঘোষ এবং শৈলজা রঞ্জন মজুমদার।
পঙ্কজ মল্লিকের গান শুনে সুচিত্রা রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কবি বিষ্ণু দে সুচিত্রার গানে ' নিরুদ্ধ বেদনা ' ও ' অব্যক্তের সুর ' খুঁজে পেয়েছেন এবং তাঁর গান ও রঙের মাধ্যমে
অসীমের সঙ্গে অব্যক্তের সংযোগ অনুভব করেছেন। লিখেছেন, সুচিত্রার গানের গভীর আবেগ , প্রকৃতি ও অসীমের সার্থক মেলবন্ধনের কথা। তাঁর গানে কীভাবে মনের বৈভব মূর্ত হয়ে ওঠে তা জানতে হলে পড়তেই হয় বিষ্ণু দে'র বিখ্যাত কবিতা ' সুচিত্রা মিত্রের গান শুনে ' । নিছক স্বরলিপির প্রতি মান্যতায় যাঁর গানের আকুলতা তথা ঐশ্বর্যের তল মেলে না তাঁরই নাম সুচিত্রা মিত্র , যাঁর জীবন-দেবতা ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored










