বংশের সবাই মারা যাওয়ার পরও রাবনের মা নিকষা কিসের আশায় বেঁচেছিলেন ? 
লঙ্কায় রামের সঙ্গে যুদ্ধে রাক্ষসবংশ ধ্বংস হওয়ার পর বেঁচেছিলেন শুধুমাত্র নিকষা। তাঁর কাছে 
' এর পরেও তিনি বেঁচে আছেন কেন ' জানতে চাওয়া হলে তিনি নাকি বলতেন, শ্রীরামের আরও কিছু লীলা দেখার আশায় তিনি বেঁচে আছেন। 

' লীলা ' শব্দটা দেবদেবী কিংবা অবতারদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।  ফুটবলারদের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যবহার করা হয়  ' জাদু ' , ' ভেলকি ' ইত্যাদি শব্দ। স্ট্রাইকার, স্টপার, মিডফিল্ডার ছেড়ে আমরা যদি গোলকিপারদের ক্যারিশমা নিয়ে আলোচনা করি তাহলে পরপর কয়েকটা বিখ্যাত নাম চলে আসে। লেভ ইয়াসিন, গর্ডন ব্যাঙ্কস, দিনো জফ, অলিভার কান, ক্যাসিয়াস, বুফন প্রমুখ ভয়ঙ্কর দুঃসাহসী এবং প্রায় দুর্ভেদ্য গোলরক্ষকদের কিছু অবিস্মরণীয় সেভ ইতিহাস হয়ে আছে। এঁরা সকলেই নিজের নিজের ক্ষেত্রে অনন্য, অসামান্য। কিন্তু মাত্র একটা সেভ যে একজন গোলরক্ষককে অমর করে দিতে পারে তা আমরা জানতেই পারতাম না যদি আমরা রেনে হিগুয়েতাকে না দেখতাম। 

ঘটনাটা ১৯৯৫ সালের। ৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে একটা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও কলম্বিয়া। ম্যাচের এক পর্যায়ে ইংল্যান্ড মিডফিল্ডার জেমি রেডন্যাপ গোলবক্সের অনেকটা বাইরে থেকে দূরপাল্লার একটি শট নেন। সাধারণ কোনো গোলকিপার হলে বলটি হয় ফিস্ট করে বার করে দিতেন অথবা তালুবন্দী করতেন। কিন্তু সোজা পথে চলার বান্দা ছিলেন না হিগুয়েতা। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত ব্যতিক্রম। সবসময় অভিনব কিছু করার জন্য প্রাণ ছটফট করতো তাঁর। তিনি কী করলেন ? বলটা ডিপ করে গোলে ঢোকার মুখে হিগুয়েতা বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে নিজের শরীরটি ভাসিয়ে দিলেন। একেবারে গভীর জলে সাঁতার কাটার অপরূপ ভঙ্গিতে দু'পায়ের গোড়ালি জোড়া করে স্করপিয়ন কিক করে গোলটা বাঁচালেন। বলটা আবার মাঠে এলো। এই অভাবনীয় সেভ আগে কখনও দেখেনি ফুটবল বিশ্ব । মাঠে উপস্থিত দর্শকরা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এ কি আশ্চর্য কাণ্ড দেখলেন তাঁরা! এভাবেও ভাবা যায়, সেভ করা যায়? উচ্ছাসে ফেটে পড়লো গোটা স্টেডিয়াম ।

এই অভিনব উদ্ভাবনে রাতারাতি কিংবদন্তি হয়ে গেলেন রেনে হিগুয়েতা । তাঁর এই ভেলকি ভিডিও-র
মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো সারা পৃথিবীতে। গোটা বিশ্ব মন্ত্রমুগ্ধের মতো বারবার দেখলো পাগলাটে গোলকিপারের অসম্ভব কাণ্ড। কেউ বললো ঐশ্বরিক, কেউ বললো অতিমানবীয়, আবার কেউ বা বললো স্করপিয়ন কিক সেভ। 

শিহরণ জাগানো এই আশ্চর্য সেভ দেখলে আজও চমকে উঠতে হয় , বারবার দেখেও মন ভরে না। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না এমনভাবে একশো শতাংশ ঝুঁকি নিয়ে গোল বাঁচানো যায়!  আসলে সোজা পথে, প্রচলিত প্রথা মেনে, ঝুঁকিহীন নিরাপদ জীবন সকলেই যে পছন্দ করবেন এমন কোনো নিয়ম নেই।
কেউ কেউ কবি সুকুমার রায়ের কবিতার ভাষায় ' অসম্ভবের ছন্দে ' থাকতে ভালোবাসেন। হিগুয়েতা তেমনই একজন। পথ হারাবেন বলেই তিনি পথে নেমেছেন। সোজা পথের গোলকধাঁধা তাঁর ভালো লাগে না। নিষেধের পাহারা থেকে ছুটি চান তিনি। সবসময় অসম্ভব কিছু ঘটানোর জন্যই সম্ভবত তিনি মাঠে নামতেন। গোলপোস্টের তলায় কিংবা গোলবক্সে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা একদমই পছন্দ করতেন না তিনি। গোল ছেড়ে বারবার বেরিয়ে খেলা তৈরি করা ছিল তাঁর প্রিয় সখ। তাই তাঁকে বলা হতো সুইপার কিপার। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতেন তিনি। তাঁর এসব অপ্রত্যাশিত কাণ্ডের জন্য বহুবার বিপদে পড়েছে তাঁর দল। তিনি ধিকৃত হয়েছেন, কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু নিজেকে বদলান নি। একবার তো তাঁর একটা মারাত্মক ভুলে তাঁর দেশ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে ম্যাচে তাঁর ভুলেই বিদায় নিয়েছিল কলম্বিয়া।

৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার রেনে হিগুয়েতা । তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে অ্যাটলেটিকো ন্যাশনালের হয়ে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে শেষ ১৬-য় তুলতে তাঁর ভূমিকা ভোলা যায় না। ১৯৬৬ সালের ২৭ অগাষ্ট কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে তাঁর জন্ম। পেশাদার ফুটবল শুরু করেন ১৯৮৫ সালে। তাঁর ডাকনাম এল লোকো। তিনি অনায়াসে স্ট্রাইকার হতে পারতেন। দারুণ ড্রিবলিং করতেন, অসাধারণ ফ্রি কিক মারতেন। তাঁর দীর্ঘ ২৪ বছরের ফুটবল জীবনে তিনি ৪৪ টি গোল করেছেন। গোলপোস্টের নিচে স্থির ও শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনোদিন ভালো লাগে নি তাঁর। ভাগ্যিস ভালো লাগে নি, তাই আমরা দেখতে পেয়েছি অনবদ্য সেই স্করপিয়ন কিক সেভ, যা দেখার পর বেঁচে থাকার স্পৃহা ক্রমেই বাড়তে থাকে।