বিষাদ রচনা করছেন মেহেদী হাসান। আলাপে , বিস্তারে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করছেন বিপন্নতা। নানা ধরনের বিষাদ, বহুমাত্রিক বিপন্নতা। রচনা করছেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া একটি হৃদয়ের নিঃসীম নিঃসঙ্গতা। সুরে সুরে আঁকছেন ক্ষয়ে যাওয়া, নিভে আসা একটি মানুষের উদভ্রান্ত দৃষ্টি , কোথাও কোনো আলো খুঁজে পাচ্ছে না অসহায় যে চোখদুটি। একটু পরেই তিনি গাইবেন কবি আলমতাব তাশ্ন-র অসামান্য গজল,
" মেরি তরহ্ সর-এ-মেহেফিল
উদাস থা উয়ো ভি
কিসিনে হাল যো পুছা তো
রো দিয়া উয়ো ভি... " ।
এই বিপুল বিষাদ, এই বিরামহীন বিপন্নতার ওপারে যাওয়ার জন্য দ্রুত হাঁটছেন এক আশ্চর্য লেখক । তাঁর হাতে বেশি সময় নেই, তিনি ভয়াবহ যক্ষ্মায় আক্রান্ত, মাত্র ৪১ বয়সেই যাঁকে চলে যেতে হবে পৃথিবী ছেড়ে। অশান্ত, উদভ্রান্ত জীবনানন্দ কবিকে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। আহা, এই কবি চেয়েছিলেন স্থবিরতা! আর ' গ্রেগর সামসা ' - র স্রষ্টা ? তিনিও তো একটুখানি শান্তি কামনা করেছিলেন। পেয়েছিলেন কি ?
হ্যাঁ, পেয়েছিলেন বটে, তবে জীবনের একবারে শেষবেলায় এসে। শেষবেলা আবার কি ? মাত্র একচল্লিশের তো জীবন! তুমুল অশান্তি, সাগরের ঢেউয়ের মতো অবিশ্রান্ত অস্থিরতা, সীমাহীন ঝঞ্ঝাঝড় আর মহৎ ডিপ্রেশনেই শেষ হয়ে গেলো একটা তরঙ্গময় জীবন। তার মধ্যেই তিনি লিখে ফেললেন ' দ্য মেটামরফসিস ' ( The Metamorphosis) , ' দ্য ট্রায়াল ' ( The Trial ),' দ্য ক্যাসল ' ( The Castle, একটি অসমাপ্ত অনবদ্য উপন্যাস ) ইত্যাদি ।
কাফকা-র নাম তো জানে গোটা দুনিয়া। কাফকার সেই তাহার নামটি ডোরা। ডোরা ডিয়মান্ট ( Dora Diamant ) , যিনি ফ্রানৎস কাফকা- র ( Franz Kafka ) সর্বশেষ প্রেমিকা। যিনি লেখকের শেষ দিনগুলোতে ছায়ার মতো পাশেপাশে ছিলেন, এমনকি সাহিত্যিকের মৃত্যুর মুহূর্তেও। ইনিই সেই নারী, যিনি কাফকাকে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলেন।
কাফকা জীবনে কখনও বিয়ে করেন নি। তিনি ছিলেন ভীষণ স্বাধীনচেতা। বন্ধনহীন গ্রন্থি তাঁর পছন্দ। পারিবারিক জীবন ও সাধারণ সুখের ধারণার সঙ্গে তাঁর শিল্পীসত্তা ও মানসিক গঠন একেবারেই খাপ খেতো না। তাঁর মনে হতো তাঁর নিঃসঙ্গতাবোধ ও স্থায়ী অসুস্থতা তাঁর সঙ্গীর জীবন নষ্ট করে দেবে। তাই কাছে আসার চেয়ে দূরে থাকাকেই তিনি নিরাপদ মনে করতেন। সরাসরি যোগাযোগের চেয়ে চিঠির মাধ্যমে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে বেশি পছন্দ করতেন।
তাঁর প্রথম প্রেমিকা ফেলিস বয়ের ( Felice Bauer ), যাঁর সঙ্গে দুবার বাগদান হলেও তাঁর বিয়ে হয় নি। কারণ, কাফকার অন্তহীন দ্বিধা, ভয়। চেক লেখিকা মিলেনা-র সঙ্গে ( Milena Jesenska ) কাফকার ছিল অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক। মিলেনাকে লেখা কাফকার চিঠিগুলো বিশ্বসাহিত্যে অনন্য। কিন্তু মিলেনা ছিলেন বিবাহিত। আর কাফকার জটিল মনস্তত্ত্ব এই গভীর প্রেমের সম্পর্কটিকেও টেনে নিয়ে যায় বিচ্ছেদের দরজায়।
" আমার ভেতরের অন্ধকার আর ভয়াবহ একাকীত্ব তোমাকেও গ্রাস করুক আমি চাই না, তাই আমাদের দূরে দূরে থাকাই ভালো " , একথা কাফকা চিঠিতে লিখতেন তাঁর প্রেমিকাদের।
আজন্মলালিত অবসাদ ও বিপুল বিমর্ষতা তাঁকে কোথাও থিতু হতে দেয় নি। বারবার তিনি পালাতে চেয়েছেন নিজের কাছ থেকে। পারেন নি। পালানো যেমন হয় নি, ফেরাও হয় নি কোথাও। লেখা থেকে লেখা, নারী থেকে নারী, নাতিদীর্ঘ জীবনে নিজেকে নিয়ে দ্বিধা , সংশয় আর আত্মবিশ্বাসের অভাব লেখককে একফোঁটা বিশ্রাম পেতে দেয় নি।
শুধু চিঠিপত্রে নয়, নিজের স্থায়ী বিপন্নতার ছবি বারবার উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাসে নানা রঙে। তাঁর আরও দুই ক্ষণস্থায়ী প্রেমিকার নাম গ্রেটা ব্লখ এবং ইউলি ওরিৎজেক। তাঁর আনন্দের মোড়কে লেখা অবসাদের বার্তা পছন্দ করেছেন সব প্রেমিকাই । কিন্তু কাছে আসতে বাধা দিয়েছেন স্বয়ং কাফকা। লেখকের পাঁচ প্রেমিকার তিনজনই মারা যান নাৎসিদের হাতে। এঁরা হলেন গ্রেটা , ইউলি এবং মিলেনা।
ডোরার বাহুডোরে বাঁধা পড়ে মনখারাপ থেকে ছুটি চেয়েছিলেন কাফকা। পেয়েছিলেনও সামান্য। সংসারে চরম অনটনের মধ্যেও মাত্র কয়েকমাস বসেছিল আনন্দের হাট। ফুলের তোড়া হাতে ডোরার মায়াজড়ানো অশ্রুসিক্ত মুখ দেখতে দেখতে কাফকার ঘনিয়ে এলো ঘুমের ঘোর । প্রবল যন্ত্রণার মধ্যেও মৃদু হাসলেন জরাজীর্ণ লেখক। তারপর চোখ বুজলেন চিরদিনের মতো। শেষ হয়ে গেল এক অশান্ত প্রেমিকের প্রেমযাত্রা। ফেলিসকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েও যখন দ্বিতীয়বার ভেঙে দিলেন সম্পর্ক, তখন বললেন, " যা করলাম সবই তোমার মঙ্গলের জন্য, আমার ফুসফুসের অবস্থা খুবই খারাপ, এ অবস্থায় বিয়ে করা অসম্ভব, মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে অনবরত, শক্তি কমে আসছে আমার। "
কাফকার শেষের দিকে লেখা একটি চিঠিতে লেখা ছিল, ' My boat is fragile. I will never be well again. '














