বিয়ে বৈধ কি না, সেই প্রশ্নেই থেমে থাকবে না বধূ নির্যাতনের মামলা। ‘আইনগতভাবে নিখুঁত’ বিয়ে না হলেও যদি প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণে স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘরোয়া সম্পর্ক এবং নিষ্ঠুরতার অভিযোগের ইঙ্গিত মেলে, তা হলে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় দায়ের হয়ে মামলা চলতে পারে। সম্প্রতি এমনই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। আইনজীবী মহলের মতে, বিবাহিত মহিলাদের উপর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নির্যাতন রুখতে ১৯৮৩ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ৪৯৮এ ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। এই ধারায় কোনও বিবাহিত মহিলার উপর স্বামী বা তাঁর আত্মীয়ের শারীরিক কিংবা মানসিক নিষ্ঠুরতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হত। তবে এই ধারার অপব্যবহার রুখতে অভিযোগ দায়ের হলেই স্বামী বা তাঁর আত্মীয়দের ঢালাও গ্রেফতার না করার বিষয়ে আগেই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন মেনে তদন্তের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ করার কথা বলা হয়েছে।

এই আইনি প্রেক্ষাপটেই ৪৯৮এ ধারার প্রয়োগ নিয়ে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। বিচারপতি উদয়কুমারের এজলাসে আবেদন করেন এস কে আজহারউদ্দিন ওরফে আকাশ (SK Azharuddin alias Akash)। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা খারিজের আর্জি জানান তিনি। বর্ধমান থানায় (Bardhaman Police Station) দায়ের হওয়া একাধিক মামলার প্রসঙ্গ তুলে নিম্ন আদালতের চার্জশিট বাতিলের আবেদন করেন অভিযুক্ত। মামলার সূত্রে খবর, আকাশের বিরুদ্ধে নির্যাতন, প্রতারণা-সহ একাধিক অভিযোগ এনেছেন কোয়েল বেগম ওরফে জয়া রায়। অভিযোগে ধর্মান্তরের প্রসঙ্গও রয়েছে। জয়ার দাবি, বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০১৯ সালে তাঁর সঙ্গে আকাশের পরিচয় হয়। সেই সময় অভিযুক্ত নিজেকে অবিবাহিত এবং অনাথ বলে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে বিয়ের মতো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন জয়া। এরপরেই তাঁর উপর নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা এবং তোলাবাজির মতো অভিযোগ ওঠে আকাশের বিরুদ্ধে। সেই মামলাকেই চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।

মামলা খারিজের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে, মামলার প্রাথমিক পর্যায়েই শুধুমাত্র বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গোটা ফৌজদারি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া যায় না। অভিযোগের মধ্যে যদি বিয়ের মতো সম্পর্কের উপাদান এবং নিষ্ঠুরতার প্রাথমিক প্রমাণ থাকে, তা হলে ৪৯৮এ ধারায় মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ফলে আকাশের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে চলা মামলা বন্ধ করার কোনও কারণ দেখেনি হাইকোর্ট। আবেদন খারিজ করে নিম্ন আদালতের প্রক্রিয়া চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী মহলের মতে, এই পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য যথেষ্ট। কারণ, কোনও সম্পর্ককে শুধুমাত্র ‘আইনগত বিয়ে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি না সেই প্রশ্নের আড়ালে যদি দীর্ঘদিনের দাম্পত্যসদৃশ সম্পর্ক এবং নির্যাতনের অভিযোগ থাকে, তা হলে শুধুমাত্র বিয়ের বৈধতার প্রশ্ন তুলে ফৌজদারি অভিযোগের বিচার থামিয়ে দেওয়া যাবে না এই বার্তাই দিয়েছে আদালত।