যেভাবে প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ছড়ানো হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলে বিজেপি সরকারের দ্বিমুখী নীতি ও চরম দেউলিয়াপনাই প্রকাশ পায়। বিজেপির এই দ্বিচারিতা আজ সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে গিয়েছে। লিখছেন তৃণমূল মুখপাত্র ড. প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায়।
মমতাবাদের কাছে ম্লান প্রশাসনিক চক্রান্ত, প্রকাশ্যে বিজেপি সরকারের দেউলিয়াপনা!
Sponsored

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা কিংবা অতি-সক্রিয়তার ফলে পুলিশের হেফাজতে নির্মম শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা নতুন মাত্রা নিয়েছে, তবে হালিসহরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি করেছে। প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর জেনি শর্মার স্বামী বিরজু কেওটকে যেভাবে পুলিশি হেফাজতে আটকে রেখে পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করা হল, তা গত তিন দশকের ইতিহাসে বিরলতম ও অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা বললেও কম বলা হয়। জেনি শর্মা স্বয়ং পুলিশি নির্যাতনের যে বর্ণনা সামনে এনেছেন, তা এক কথায় অপদার্থ পুলিশি ব্যবস্থা এবং হেফাজতে থাকা নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের এক কদর্য দৃষ্টান্ত। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে সরকারি পক্ষ যে রাজনীতি শুরু করেছে, এবং যেভাবে প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ছড়ানো হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলে বিজেপি সরকারের দ্বিমুখী নীতি ও চরম দেউলিয়াপনাই প্রকাশ পায়।
একদা পুলিশি অপরাধ বা কোনও নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই সরাসরি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাড়ে এবং তাঁর সরকারের ওপর দায় চাপানোর এক অভ্যস্ত রাজনৈতিক ধারা দেখা গেছে। যেকোনও অনভিপ্রেত ঘটনার সম্পূর্ণ দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ছিল তৎকালীন বিরোধীদের চেনা কৌশল। কিন্তু বর্তমানে বারুইপুরের ঘটনা হোক কিংবা হালিসহরের প্রেক্ষাপট— পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা অতি-সক্রিয়তা, উভয়ক্ষেত্রেই প্রশাসন কোনওরকমে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, সরকার এক অদ্ভুত ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে মনে হয় সরকার এই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত নয় শুধু পুলিশই দোষী! অতীতের পুলিশি অপদার্থতার দায় যদি তৎকালীন সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে, তবে আগের মতোই আজ পুলিশি অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সরকাররের ভূমিকা নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হবে না? পুলিশের স্বাধীন আইনি তদন্ত ব্যবস্থা এবং সরকারের প্রশাসনিক নির্দেশনার মধ্যে ফারাক তৈরি করে ইচ্ছাকৃত সরকারের ভূমিকা ঝাপসা করে দেওয়াই বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হালিশহরে নিহত বিরজু কেওটের পরিবারকে জাতীয় আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (NALSA) নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যখন ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্য বা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা হল, তখন অন্য এক ঐতিহাসিক বিরোধিতার স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। আরজি কর হাসপাতালের মর্মান্তিক কাণ্ডে নির্যাতিতা তিলোত্তমার মৃত্যুর পর প্রশাসনিক বিধি মেনে যখন সমপরিমাণ আর্থিক সাহায্যের কথা উঠেছিল, তখন বিরোধী বিজেপি অত্যন্ত কুরুচিকরভাবে অভিযোগ এনেছিল যে সরকার নাকি ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে নিহতের পরিবারকে ‘কিনে নিতে’ চাইছে! আজ যখন হালিসহরে একই সরকারি নিয়মকানুন মেনে সাহায্যপ্রদান করা হচ্ছে, তখন বর্তমানের বিজেপি সরকার আবার ভিন্ন সুর গাইছে। সরকারি নিয়ম মেনে চললেও কীভাবে তদানীন্তন তৃণমূল সরকারকে অন্যায় ভাবে নাস্তানাবুদ ও কালিমালিপ্ত করা হয়েছে, বারুইপুর বা হালিসহরের ঘটনায় তৎকালীন বিরোধী এবং বর্তমান শাসকের এই অবস্থান বদল তারই প্রমাণ দেয়। যা তাদের নীতিহীন মানসিকতারই পরিচয়!
গণতান্ত্রিক অধিকারের চরম দোহাই দেওয়া বিজেপির রাজনীতিকদের আসল রূপ ফুটে ওঠে তখন, যখন দেখা যায় জননেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং হালিসহরের মতো এলাকায় পরিদর্শনে গেলে তাঁর ওপর সুপরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়। সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর সফরের সময় অশালীন কদর্য ভাষার প্রয়োগ ও কুৎসিত আক্রমণ কোনও সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অঙ্গ হতে পারে না। এবং সরকারের পক্ষে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী উক্ত আক্রমণকে ঘুরপথে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? কারণ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সর্বসমক্ষে বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এটা হওয়াই সমীচীন! সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, রাজ্য রাজনীতির এই নোংরা আক্রমণের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা যখন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজপথে প্রতিবাদ জানাতে নামলেন, তখন সেই সাধারণ কর্মীদের বেআইনিভাবে আটক ও হেনস্থা করা হল। একদিকে রাজ্যের প্রাক্তন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ ও নোংরা ভাষার ব্যবহার, অন্যদিকে ন্যায়ের দাবিতে রাজপথে নামা অনুগামীদের নির্বিচারে আটক— এই বৈষম্যমূলক আচরণই প্রমাণ করে কীভাবে সরকার রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিবেশকে উত্তপ্ত রাখতে চাইছে।
তবে রাজপথের এই উত্তাপের রেশ আছড়ে পড়েছে রাজ্য বিধানসভার অন্দরেও। বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ও কুণাল ঘোষের যোগ্য নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দল যখন এই অন্যায় ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তোলে, তখন অন্যায়ভাবে বিরোধীদল হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া শিবিরের ফাটল ও চরম সত্য প্রকাশ্যে চলে আসে। তথাকথিত ‘চাটন শিবিরে’ নাম লেখানো প্রায় ৬০ জন বিধায়কের মধ্যে তিন জন বিধায়ক বিধানসভার ভেতরে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ও জনভিত্তি ছাড়া তারা পঞ্চায়েত বা পুরসভা স্তরে ১০টি ভোটও পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও সাধারণ মানুষের ওপর অগাধ প্রভাবই বিজেপির সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ।
রাজনীতিকে আইনি লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের বিচারে ‘ট্রায়াল’ চালানোর যে প্রবণতা বিজেপি শুরু করেছে, তাও সম্প্রতি মুখথুবড়ে পড়েছে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে লাগাতার অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল যে তিনি আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতে বিদেশ পালিয়ে যাবেন! কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট যখন তাঁর সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পূর্ণ অনুমতি দিল, তখন সমস্ত রাজনৈতিক কুৎসার বেলুন ফুটো হয়ে গেল। একইভাবে, ডিজে বাজানো কিংবা স্থানীয় কিছু বিতর্কিত মামলায় যখন বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতাদের সংবাদমাধ্যমের বিচারে ‘দোষী’ বানানোর চক্রান্ত হয়, তখন কিন্তু জুন মালিয়া বা এনসিপিআই-এর সাংসদেরা বিরোধী আক্রমণে বিদ্ধ হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থার বালাই থাকে না। আইনি নিরপেক্ষতা ধ্বংস করে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিজেপির এই দ্বিচারিতা আজ সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে গেছে।
শেষে এটিই বলা যায় যে, কেউ কোনও অপরাধ করলে আইন তার নিজস্ব গতিতে বিচার করবে এবং তৃণমূল কংগ্রেস কাউকেই আড়াল করবে না। কিন্তু নানান অজুহাতে যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের মতো সুসংগঠিত গণশক্তিকে মুছে ফেলার স্বপ্ন দেখছেন, তারা ভুলের স্বর্গে বাস করছেন। তৃণমূল কর্মীদের যতই অন্যায়ভাবে আটক বা হেনস্থা করা হোক না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে বিশ্বাসী কর্মীরা বুক চিতিয়ে মাঠেই লড়াই করবেন। বিজেপি নেতৃত্বের মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলার ২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের পক্ষে ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। আর ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন খুব বেশি দূরে নয়। বিজেপির এই লাগাতার কুৎসা, মিথ্যাচার ও চক্রান্তের জবাব দিতে ২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের এই ভোটব্যাংক বেড়ে ৩ কোটিতে পৌঁছানো সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমতের এই প্রবল জোয়ারেই ভেস্তে যাবে বিরোধীদের সমস্ত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আবার জিতবে বাংলা, সকলে বলবে— মমতাবাদ জিন্দাবাদ।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













