অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়ের (Partha Pratim Ray) শিক্ষায় অবদান ঠিক কতটা? সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমের বিতর্কসভায় গিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) অধ্যাপক (Professor) পার্থপ্রতিম রায়কে উদ্দেশ করে এই প্রশ্নই ছুড়ে দেন বিধায়ক সজল ঘোষ (Sajal Ghosh)। প্রশ্নটা শুনতে যতটা সরল, বিষয়টা আদৌ ততটা সরল নয়। কারণ যাঁকে নিয়ে এই প্রশ্ন, তিনি শুধুমাত্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নন, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে পরিচিত এক গবেষকও।

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক নেতাদের পুজো উদ্বোধন নাপসন্দ দিলীপের! বদলের বার্তা মন্ত্রীর

এই প্রশ্ন শুধু অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়ের কাছেই অপমানজনক নয়, গোটা শিক্ষা সমাজের কাছেই যথেষ্ট দুর্ভাগ্যজনক বলেই মনে করছে শিক্ষামহল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, একজন শিক্ষাবিদের বক্তব্য বা অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু তাঁর কয়েক দশকের গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানকে এক কথায় খাটো করে দেওয়ার আগে তাঁর কাজের দিকে একবার তাকানোও কি জরুরি নয়?

অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়কে শিক্ষাজগতের দিকপাল বললেও হয়তো কম বলা হবে। পদার্থবিদ্যা বিভাগের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই অধ্যাপক দীর্ঘদিন ধরে ন্যানোম্যাটেরিয়াল, সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইস, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি এবং নবীকরণযোগ্য শক্তি নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। তাঁর গবেষণার পরিধি শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলেও তাঁর কাজের স্বীকৃতি রয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘কিং স্টাইলে’ এন্ট্রি, মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গৃহপ্রবেশের আগেই বিগ বসে জীতুর ধামাকা!

যুক্তরাজ্যের The Royal Society of Chemistry ২০২৩ সালে তাঁকে ফেলো হিসেবে আজীবন সম্মাননা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের University of Delaware-এর Institute of Energy Conversion-এ তিনি আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, একাধিক দেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্পে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ন্যানোম্যাটেরিয়াল থেকে সেমিকন্ডাক্টর, সৌরবিদ্যুৎ থেকে নবীকরণযোগ্য শক্তি। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে সিলিকন-ভিত্তিক থিন-ফিল্ম এবং হেটেরোজাংশন সোলার সেল নিয়ে তাঁর কাজের গুরুত্ব রয়েছে। এই গবেষণার সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও যুক্ত হয়েছে। তাঁর গবেষণার প্রযুক্তিকে ভারতের Department of Atomic Energy গ্রহণ করেছে বলেও জানা যায়।

শুধু সূর্যের আলো থেকে শক্তি আহরণ নয়। দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো যান্ত্রিক কম্পন থেকেও কীভাবে শক্তি তৈরি করা যায়, সেই সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করেছেন অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর নেতৃত্বের কথা সামনে এসেছে।

ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ গবেষণাতেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বিশ্বজুড়ে সোলার সেল তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হল, উৎপাদন প্রক্রিয়াতেই সিলিকনের পাতলা স্তর অ্যালুমিনিয়ামের সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই সমস্যা রোধের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ক্রিস্টোফ লঁজো, পার্থপ্রতিম রায়, দিমিত্রি দাইনেকা এবং পেরে রোকা ই কাবারোকাস। এই গবেষণার সঙ্গে অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়ের একটি আন্তর্জাতিক পেটেন্টও রয়েছে।

 

এর সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য গবেষণাপত্র, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং একাধিক গবেষণা প্রকল্প। তাহলে আবারও সেই প্রশ্নে ফেরা যাক, অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়ের শিক্ষায় অবদান ঠিক কতটা? তার উত্তর হয়তো কোনও রাজনৈতিক বিতর্কসভায় দাঁড়িয়ে দেওয়া যায় না। একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষকের অবদান বিচার করতে হয় তাঁর কাজ, গবেষণা, প্রকাশনা, পেটেন্ট, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং তাঁর তৈরি করা জ্ঞান দিয়ে।

রাজনৈতিক মত, দল বা আদর্শ, যা-ই হোক না কেন, সেই পরিচয়ের বাইরে একজন উচ্চমার্গীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে তাঁর কাজের মূল্যায়ন হওয়াটাই কি বেশি যুক্তিসঙ্গত নয়? রাজনীতি তার নিজের জায়গায় থাকুক। কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার জগতকে অন্তত তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া উচিত বলেই মনে করছে শিক্ষামহল।