পুজোর চারটে দিন তিলোত্তমার বাকি অংশ যখন জনসমুদ্রে ভাসে, শহরের প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিট যেন তখন ব্রাত্য, কিছুটা দুয়োরানিই। সপ্তমী থেকে দশমীর দিনগুলোয় শ্রীভূমি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার কিংবা চেতলা অগ্রণীতে যখন তিলধারণের জায়গা থাকে না, ব্যস্ততম এই সরণিতে তখন স্রেফ কিছু খাদ্যরসিক মানুষের আনাগোনা ছাড়া কার্যত শুনশান ছবিই দেখা যায়। কারণ একটাই— আলোর রোশনাই আর সাবেক স্থাপত্যের এই চত্বরে কোনও সার্বজনীন দুর্গাপুজো ছিল না। তবে এবার সেই চেনা সমীকরণ বদলাতে চলেছে। বড়দিনের উৎসবের চেনা ঠিকানা অ্যালেন পার্কেই এ বছর প্রথম বার বসতে চলেছে দুর্গাপুজোর আসর।

উদ্যোক্তা ‘কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘ’। ইতিমধ্যেই শহর জুড়ে তাদের রহস্যে মোড়া টিজার হোর্ডিং পড়েছে— ‘কে আসছে?’ সঙ্ঘের সম্পাদক নবীন মিশ্রের বক্তব্য, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের ফলেই এই সুযোগ তৈরি হয়েছে।’’ জানা গিয়েছে, গণেশ চতুর্থীর দিনেই হয়ে গিয়েছে ভূমিপুজো। সঙ্ঘের সভাপতি শঙ্কুদেব পণ্ডা জানিয়েছেন, মহালয়ার পরের দিন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী এই পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আঁচ পড়েছে পার্কের দেওয়ালেও। এত দিন যে পার্কে নীল-সাদার ছোঁয়া দেখা যেত, সেখানে এবার পড়ছে রুদ্রাক্ষের রঙের প্রলেপ। মণ্ডপ নির্মাণের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন শিল্পী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তবে প্রতিমা রূপকারের নাম এখনও খোলসা করতে নারাজ উদ্যোক্তারা। সাধারণত ডিসেম্বরের শেষে ধর্মতলা মোড় থেকে মল্লিকবাজার পর্যন্ত প্রায় দু’কিলোমিটার রাস্তা ক্রিসমাসের আলোয় সাজত। এবার সেই সাজ দেখা যাবে দুর্গাপুজোতেই, অন্তত দু’মাস আগে। আলোর কারুকাজে থাকছে যৌথ ছোঁয়া— রাস্তার অর্ধেক সাজাবেন চন্দননগরের শিল্পীরা, বাকি অর্ধেকের দায়িত্বে কাঁথির কারিগরেরা।

মহালয়া থেকেই মণ্ডপে শুরু হবে বৈদিক স্তোত্রপাঠ। চতুর্থী থেকে বাংলার লোকশিল্পী ছাড়াও জাতীয় স্তরের শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। অষ্টমীর ধুনুচি আরতিতেও বিশেষ চমক থাকবে বলে জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, উদ্যোক্তাদের দাবি, এ রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব তো বটেই, এই পুজো দেখতে হাজির হতে পারেন বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও।

কিন্তু বড়দিনের ঐতিহ্যে মোড়া অ্যালেন পার্কে হঠাৎ দুর্গাপুজো কেন? শঙ্কুদেবের পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘এত দিন এখানে পুজো হয়নি কেন?’’ পাশাপাশি তিনি যোগ করেন, রাজ্যে সনাতনী আদর্শের সরকার প্রতিষ্ঠিত বলেই এই আয়োজন। তবে কি পার্ক স্ট্রিটের চিরাচরিত বড়দিনের উৎসব এবার ফিকে হবে? জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে সঙ্ঘের সম্পাদক নবীন মিশ্রের আশ্বাস, ‘‘বড়দিন যেমন জাঁকজমক করে হতো, তেমনই হবে। দুর্গাপুজোও হবে। আমরা সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ক্রিসমাসেও একইভাবে আলোয় সেজে উঠবে অ্যালেন পার্ক।’’ সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরের আগেই অক্টোবরের শারদোৎসবে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ দেখার অপেক্ষায় পার্ক স্ট্রিট।