২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল (Nobel Prize) পুরস্কার পেলেন বেলজিয়ামের পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হালজেনকে (Francis Halzen)। মঙ্গলবার দুপুরে 'রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস' জানিয়েছে, 'আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি'-র গবেষণায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং উচ্চ-শক্তির 'নিউট্রিনো'র খোঁজ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: মস্তিষ্কের কার্যকলাপ নিয়ে গবেষণা! চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (Royal Swedish Academy of Sciences) জানিয়েছে, মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত এই পদার্থবিদকে এই সম্মান প্রদান করা হচ্ছে। দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে উচ্চ-শক্তির 'নিউট্রিনো'-র খোঁজ পাওয়া সম্ভব- এই সংক্রান্ত একটি তত্ত্ব হালজেন প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে। এর পরে ধীরে ধীরে তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে 'আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি'। সেখানে স্বচ্ছ হিমবাহের বরফের উপর স্থাপন করা হয় অসংখ্য আলোক-সংবেদক। যা 'নিউট্রিনো'-র সঙ্গে নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষে তৈরি ক্ষীণ আলোর তরঙ্গ তথা ঝলককে শনাক্ত করতে সক্ষম।

মহাজাগতিক নিউট্রিনো হল এমন এক রহস্যময় কণা, যার কোনও বৈদ্যুতিক আয়ন নেই এবং ভর শূন্যের কাছাকাছি। ফলে এরা প্রায় কোনও কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না-খেয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে মহাজাগতিক বস্তু (যেমন, ব্ল্যাক হোল বা সুপারনোভা) থেকে সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। এদের শনাক্ত করতে এমন একটি মাধ্যমের প্রয়োজন, যা স্বচ্ছ এবং ঘন অন্ধকারে ঢাকা। দক্ষিণ মেরুর প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীরের বরফ এই কাজের জন্য আদর্শ। কারণ, প্রচণ্ড চাপে সেখানে কোনও বাতাসের বুদবুদ থাকে না এবং তা কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। ফ্রান্সিসের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের বরফে গভীর গর্ত তৈরি করেন। বরফের ১.৪৫ কিলোমিটার থেকে ২.৪৫ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত মোট ৮৬টি লম্বা তার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

এর পরে ওই ৮৬টি তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ৫,১৬০টি অতি সংবেদনশীল আলোক সেন্সর, যেগুলোকে বলা হয় 'ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল' (ডম)। এই পুরো ব্যবস্থাটি বরফের নীচে ১ কিউবিক কিলোমিটার (১০০ কোটি ঘনমিটার) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নিউট্রিনো ডিটেক্টর। মহাকাশ থেকে আসা কোটি কোটি নিউট্রিনো কোনও বাধা ছাড়াই পৃথিবী এবং এই বরফ ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু অত্যন্ত বিরল কিছু ক্ষেত্রে, একটি উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো বরফের ভিতরের জলের পরমাণুর (অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস) সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলে 'মিউয়ন' নামক এক ধরনের দ্রুত গতির চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়। মিউয়ন যখন বরফের মধ্য দিয়ে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটে যায়, তখন একটি নীল রঙের আলোর ঝলকানি তৈরি হয়। পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে 'চেরেঙ্কভ বিকিরণ' বলা হয়। ফ্রান্সিসদের বসানো 'ডম' সেই বিকিরণ থেকেই চিহ্নিত করেছে মহাজাগতিক নিউট্রিনোকে।

আরও পড়ুন: ৪০ দিন পর নেপালে বন্ধ উদ্ধার অভিযান, এখনও নিখোঁজ ৫২৮৫! তালিকায় ১৮৯ ভারতীয়

ফ্রান্সিসের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৩ মার্চ, বেলজিয়ামের তিয়েনে। ৮২ বছর বয়সি পদার্থবিজ্ঞানী বর্তমানে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি।