দুদিন ধরে রাজধানীর বুকে এলাহি আয়োজন। মেনু থেকে ভেন্যু সবকিছুতেই বিশেষ চমক। কিন্তু আদৌ কি ২০২৬ সালের  ব্রিকস সম্মেলন (BRICS Summit 2026) থেকে ভারত কিছু পেল, নাকি সবটাই বাইরের চমক আর প্রাপ্তি সেই অন্তঃসারশূন্যতা? আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক। নয়া দিল্লিতে আয়োজিত অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে বাড়তে থাকা কৌতূহলের অবশেষে নিরসন হল। রবিবার এই সম্মেলনের দ্বিতীয় তথা শেষ দিনে সামনে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আখেরে বুঝিয়ে দিল ভারত মন্ডপমে আয়োজিত এই হাই প্রোফাইল সম্মেলন থেকে ভারতের প্রাপ্তি ঠিক কী বা কতটা? 

প্রথম থেকেই একটা আশঙ্কা ছিল যে এই সম্মেলন হয়তো ভারত- আমেরিকা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বড় কোনও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দিল্লির মঞ্চে রাশিয়া এবং চিনের উপস্থিতি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভালো চোখে দেখবেন না তা শুরু থেকেই আন্দাজ করা গেছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের কূটনৈতিক চাল নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালু করা কিংবা দ্রুত ডলার-বর্জনের মতো কোনও ঘোষণাও এই সম্মেলনে হয়নি। অর্থাৎ আমেরিকা বিরোধী মঞ্চ হিসেবে কখনই প্রমাণিত হয়নি ব্রিকস। বরং দ্রুত আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন থেকে শুরু করে দেশীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন, ডিজিটাল জনপরিকাঠামো,খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাঙ্কের সংস্কারকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হল রাশিয়ার সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রাখা আর আমেরিকাকে না চটিয়ে সফল বৈঠক। মূল সম্মেলনের আগে একাধিক পার্শ্ব বৈঠক করেছেন মোদি, তা সে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেই হোক বা চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে মোদি - পুতিন বৈঠকে নয়াদিল্লি-রাশিয়ার সম্পর্কের স্থায়িত্ব আবারও প্রমাণ হয়েছে বটে তবে পশ্চিমি নিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাকে ভারত পুরোপুরি সমর্থন জানায়নি। 

এবার আসা যাক চিন  ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গে। গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই শীতল হতে শুরু করে যে কার্যত তা বরফে পরিণত হয়েছিল। তাই এবারে ব্রিকসে জিনপিং আসবেন কিনা তা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। তবে শেষমেশ লাল ফৌজের দেশের প্রেসিডেন্ট শুধু এসেছেন তাই নয়, আলাদা করে বৈঠক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও। ফলে দুই দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে সরাসরি যোগাযোগের পরিসর ফিরেছে। ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি, চিন নির্ভরশীল সরবরাহ ব্যবস্থা এমনকি ভারতীয় বাজারে চিনা দ্রব্য প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞা নিয়েও আলোচনা হয়েচে বলে খবর, তবে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হল না। বরং দুই দেশ এই প্রসঙ্গই এড়িয়ে গেল। আবার পহেলগাম হামলার নিন্দা করেও সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা শব্দও খরচ না করে চিন ইসলামাবাদের সঙ্গে তার মিত্রতা বজায় রেখেছে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই বৈঠককে ভারত-চিন সম্পর্কের নতুন সূচনা বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। বরং স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে মাত্র।  

তবে বলাইবাহুল্য এবারের ব্রিকসের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হচ্ছে সর্বসম্মতিক্রমে নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন (New Delhi Declaration)গৃহীত হওয়া। পশ্চিম এশিয়ার অস্থির অবস্থার প্রেক্ষিতে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও এই ঘোষণাপত্র নিঃসন্দেহে ভারতের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য। অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনে মোদি,পুতিন ও জিনপিংয়ের একসঙ্গে উপস্থিতি বা পারস্পরিক সৌজন্যতা বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতির নিরিখে কতটা স্বস্তির ছবি তুলে ধরবে তা আপাতত স্পষ্ট না হলেও ভারত যে এই মুহূর্তে শিবির বদলাচ্ছে না সেটা স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে আগামী বছর চিনের নেতৃত্বে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনীতি কতটা কার্যকর হয় সেটাই দেখার।