কালীঘাটে (Kalighat Temple) মা কালী গায়ের গয়না কোথায়? কোথায় ধনরত্ন-সম্পদ? এবার তারই হদিশ চেয়ে আদালতে দ্বারস্থ হল সাবর্ণ পরিবার। একইসঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ১৯৮০ সাল থেকে উধাও মা কালীর সম্পদ গচ্ছিত রাখা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভল্টের চাবিও।
সতীপীঠের অন্যতম অংশ হল কালীঘাট (Kalighat Temple)। সাবর্ণ গোত্রীয় জিয়া গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী পদ্মাবতীদেবী হালিশহর থেকে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন ১৫৬৯ সালে। কথিত আছে, ১৫৭০ সালে তিনি জলের নীচে খুঁজে পান মায়ের ডান পায়ের আঙুল। তাঁকে দেখা দেন মা স্বয়ং। সেই দেহাংশকেই প্রতিষ্ঠা করা হয় পর্ণকুটিরে। আজ কালীঘাটে যে মাতৃমূর্তি প্রতিষ্ঠিত, তা সাবর্ণদের কুলদেবী ভুবনেশ্বরী মায়ের আদলে। এই মন্দিরকে ঘিরেই গুচ্ গুচ্ছ অভিযোগ জমা পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা বিচারকের কাছে, যিনি পদাধিকারসূত্রে ওই মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান।
আরও পড়ুন: কৌশিকী অমাবস্যার আগেই তারাপীঠ মন্দিরে নিয়ম বদল, বন্ধ কাগজের ভিআইপি কুপন
অভিযোগ নিয়ে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে বিচারককে জানিয়েছি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের যে ভল্টে মায়ের সম্পদ ও গয়না থাকে, ১৯৮০ সাল থেকে তার চাবির হদিশ নেই। মন্দিরের সম্পদের হিসাব রাখার যে কমিটি গড়া হয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ গিয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে সম্পদের কোনো হিসাবই হয়নি। সেখানে লুট চলেছে। আমরা অভিযোগ করেছি, কালীঘাটে সম্পদের নয়ছয় হয়েছে এবং ভক্তদের বিশ্বাস নিয়ে ছেলেখেলা হয়েছে। চাবি হারানোর ব্যাপারে দ্রুত এফআইআর করার নির্দেশ জারির আরজিও জানিয়েছি আমরা।’
কালীঘাট মন্দিরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তুলেছে সাবর্ণ পরিবার। অভিযোগ, ২০১৪ সালের পর থেকে মন্দির পরিচালন কমিটির নির্বাচন হয়নি। অথচ মন্দির সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচিত কমিটির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর।
নির্ধারিত ব্যবস্থা অনুসারে, সেবায়েতদের মধ্য থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। পাশাপাশি মন্দিরের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন ছয়জন বহিরাগত সদস্যেরও কমিটিতে থাকার বিধান রয়েছে। জেলা জজের এই কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা।
একটি বণিকসভার প্রতিনিধিরও কমিটিতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে বলে খবর। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বণিকসভার হয়ে দায়িত্বে থাকা শিল্পকর্তার মৃত্যুর পরে নতুন প্রতিনিধি চেয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি।
দেবর্ষি আরও জানিয়েছেন, ‘দক্ষিণ ২৪ পরগনা ডিএম অফিসকে ভক্তদের দানসামগ্রী দেখভালের নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু বাস্তবে সেসব দেখা যায় না। মন্দিরে গেলেই বোঝা যায়, কতটা অরাজকতা চলছে। হাইকোর্টের আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভক্তদের হেনস্থা থেকে শুরু করে মাকে দর্শনে বাধা, গর্ভগৃহে যেমন খুশি প্রবেশ চলছে অবাধে।’
কালীঘাট মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছিল। ২০০৬ সালে এই ইস্যু যায় কলকাতা হাইকোর্টেও। যা নিয়ে তৎকালীন চেয়্যারম্যান তথা জেলা বিচারক অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিচারক আক্ষেপ করেন, মন্দিরের সামগ্রিক পরিস্থিতি শোচনীয়। প্রণামি ঠিক করে জমা পড়ে না। পুজোর পালা বিক্রি হয়ে যায় বহিরাগতদের কাছে। ২০ বছর পরও যে পরিস্থিতি একই রয়েছে।
আরও পড়ুন: বাঙালিকে প্রকাশ্যে অপমান করেছেন শমীক! নিঃশর্ত ক্ষমার দাবিতে সরব তৃণমূল
মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব সামলানো কল্যাণ হালদারের বক্তব্য, ‘কাউন্সিল অব সেবায়েতস নির্বাচন নির্ধারণ করে। এখানকার সম্পাদক প্রয়াত এবং চেয়ারম্যান শয্যাশায়ী থাকায় নির্বাচন হয়নি। তবে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা বিচারককে জানানোও হয়েছে। মনে করা হচ্ছে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হবে।’
এর আগে ২০২০ সালে সেবায়েতরা জানিয়েছিলেন, প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার গয়না দান হিসেবে জমা পড়ে। সেগুলি মন্দির কমিটির খাতায় ‘সোনার মতো দেখতে’ বলে নথিভুক্ত করা হয়। তার পরে ওই সব গয়না রাখা হয় মন্দির কমিটির অফিসের আলমারিতে। কিন্তু অভিযোগ, সেগুলির সুরক্ষায় ন্যূনতম পুলিশি ব্যবস্থা নেই। শুধুমাত্র মন্দিরে ভক্তদের ভিড় সামলানোর জন্য মোতায়েন রয়েছেন হাতে গোনা কয়েক জন পুলিশকর্মী। এ ছাড়া শুধু মা কালীর গর্ভগৃহে রয়েছে সিসি ক্যামেরা।
















