বিশ্বজুড়ে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আমদানিকৃত মূল্যবৃদ্ধি ও বাণিজ্য শুল্কের অস্থিরতার মুখে ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিয়ে লোকসভায় মোদি সরকারকে তীব্র প্রশ্নের মুখে ফেললেন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল (Pratima Mondal)।

 আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে জাতীয় নীতি, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সেক্টরের কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং পুঁজিবাজারে জল্পনামূলক বেপরোয়া বিনিয়োগ রুখতে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে তাঁর তোলা প্রশ্নের লিখিত জবাব দিয়েছেন প্রয়োজনীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী। তবে সেই ব্যাখ্যায় মন্ত্রকের আত্মতুষ্টিমূলক ও আমলাতান্ত্রিক জবাবে অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির চরম অভাবই প্রকট হয়ে উঠেছে। 

সংসদে প্রতিমা মণ্ডলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রক দাবি করেছে যে, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার ঝাপটা সামলাতে ‘ইকোনমিক স্টেবিলাইজেশন ফান্ড’-এর মতো আর্থিক বাফার এবং রফতানি সহায়তায় ‘রিলিফ’ স্কিম ও ‘ইসিএলজিএস’-এর মতো একগুচ্ছ জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য দ্বন্দ্বের দরুন ভারতীয় শিল্প ও রপ্তানি ক্ষেত্র যখন ক্রমাগত মার খাচ্ছে, তখন কেবল সাময়িক আর্থিক প্রতিশ্রুতি বা ঋণের গ্যারান্টি প্রকল্প দিয়ে কীভাবে দেশের রফতানি বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ রক্ষা পাবে, তার কোনও সুস্পষ্ট রূপরেখা কেন্দ্র দিতে পারেনি।

অন্যদিকে, আনুষ্ঠানিকীকরণ ও ডিজিটাইজেশনের নামে জিএসটি ও আয়করের জালে বন্দি হওয়া এমএসএমই শিল্পগোষ্ঠীর জন্য কর প্রদেয় প্রক্রিয়া সরলীকরণের যে ছবি মন্ত্রক পেশ করেছে, তাও বাস্তব অভিজ্ঞতার একেবারে বিপরীত। জিএসটিতে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে ত্রৈমাসিক রিটার্ন বা ‘প্রিজাম্পটিভ ট্যাক্সেশন’-এর সুবিধা ঘোষণার কথা বলা হলেও প্রতিনিয়ত নিয়ম পরিবর্তন এবং জটিল প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের কারণে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কার্যত চরম প্রশাসনিক হয়রানি ও আইনি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। কাগুজে ছাড়ের আড়ালে কর ব্যবস্থার প্রকৃত জটিলতা ও তদারকির জুলুম কমানোর কোনও কার্যকর সদিচ্ছা সরকারের জবাবে স্পষ্ট হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় উন্মোচিত হয়েছে গৃহস্থের সঞ্চয় ও পুঁজিবাজারে খুচরো বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য উদ্ধৃত করে সরকার নেট গৃহস্থ সঞ্চয় বাড়ার দাবি করলেও এবং ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২২.৫ কোটিতে পৌঁছানোর ফিরিস্তি দিলেও সাধারণ মানুষের শেয়ার ও ফিউচার-অপশন (ডেরিভেটিভস) বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ জল্পনামূলক বিনিয়োগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে— সে বিষয়ে কার্যকর কঠোরতার প্রমাণ মেলেনি। সেবির হাজার হাজার সচেতনতা শিবির বা আরবিআই-এর ‘প্রজেক্ট সুদর্শন’-এর মতো নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলা হলেও, মধ্যবিত্তের জীবনভর সঞ্চয় ডেরিভেটিভস বাজারের জুয়াড়িপনায় তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে কেন্দ্রের কোনো নির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক নীতি নেই বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।