
সাহিন আরা সুলতানা
রাজনৈতিক-সমাজকর্মী, বাংলাদেশ
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। আর এই স্তম্ভের অতন্দ্র প্রহরী হলেন সাংবাদিকরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে (Bangladesh) একের পর এক সংবাদকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া, কিংবা আইনি ও সামাজিক হেনস্থার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলি নাগরিক সমাজকে এক চরম আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বরিষ্ঠ সাংবাদিক (Journalist) ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার (Bibhuranjan Sarkar) থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে বরিশালে প্রাক্তন ব্যুরো চিফ পুলক চট্টোপাধ্যায়ের রহস্যজনক ও বেদনাদায়ক মৃত্যুর ঘটনা মুক্ত সাংবাদিকতার আকাশে এক গভীর কালো মেঘের দেখে দিয়েছে।
এই যে একের পর এক প্রবীণ, সুপরিচিত কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবাদিকরা সংকটের আবর্তে পড়ছেন—তা কি নিতান্তই নিয়তির নিষ্ঠুর কাকতালীয়, নাকি মুক্ত কণ্ঠরোধ ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনও সূক্ষ্ম কৌশল? এই প্রশ্নটি আজ এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দোলাচলে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ফ্রন্টলাইনে রেখে রাজনীতি করার এক নোংরা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রবীণ কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা এখনও শুকায়নি। এর মধ্যেই বরিশালে প্রাক্তন ব্যুরো প্রধান পুলক চট্টোপাধ্যায়ের কর্মস্থলে তাঁরই মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রাথমিকভাবে একে চাকরিহীনতার কারণে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ ও তার থেকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চললেও, এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন বার্তা দেয়। একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিক কেন বছরের পর বছর চাকরিহীন থাকবেন? কেন রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাঁর মেধার মূল্যায়ন ও জীবনধারণের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে? এই প্রশ্নগুলি সরাসরি বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকেই আঙুল তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের ঘটনাগুলির পিছনে একটি গভীর ও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশল সব সময়ই সক্রিয় থাকে। যখন কোনও সমাজে বিভুরঞ্জন সরকার বা পুলক চট্টোপাধ্যায়ের মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক সাংবাদিকদের চরম সংকটে ফেলা হয় বা তাঁদের জীবনাবসান ঘটে, তখন পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার কাছে একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা চলে যায়। বার্তাটি হল—"ক্ষমতার সমীকরণের বাইরে গিয়ে সত্য প্রকাশ করলে কেউ সুরক্ষিত নয়।" এর ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরণের অবচেতন "সেলফ-সেন্সরশিপ" বা আপসকামী মানসিকতা তৈরি করা সহজ হয়।
অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবাদিকদের যখন লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তখন মাঠপর্যায়ের উগ্রপন্থী বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক ফায়দা লুঠতে তৎপর হয়ে ওঠে। এটি একদিকে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে, অন্যদিকে সমাজে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অপকৌশল মাত্র।
কর্পোরেট ও রাজনৈতিক পুঁজির মালিকানায় গড়ে ওঠা সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবাদিকদের স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, আর স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ছুড়ে ফেলে দেয়। পুলকের মতো সাংবাদিকদের এই পরিণতি মূলত সেই নির্মম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণেরই ফল।
সাংবাদিক নিধনের এই রাজনৈতিক সমীকরণ কেবল শারীরিক আক্রমণ বা রহস্যজনক মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর পিছনে কাজ করছে রাষ্ট্রযন্ত্র ও কর্পোরেট পুঁজির এক সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন। ভিন্নমতের সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে ক্ষমতার জোরে একের পর এক যে প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপগুলি নেওয়া হচ্ছে, তা যেকোনো সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজকে লজ্জিত করে।
গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার সবচেয়ে বড় আধুনিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয়পত্র বা অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা। কোনও রকম সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই, স্রেফ ভিন্নমতের বা বিগত রাজনৈতিক ব্যবস্থার তকমা দিয়ে শত শত জ্যেষ্ঠ ও পেশাদার সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। এটি কেবল একজন সাংবাদিকের অধিকার হরণ নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের পেশাগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল।
রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে এবং সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপে বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকদের একযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কর্পোরেট মিডিয়া মালিকরা নিজেদের ব্যবসা ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মুক্তমনা সাংবাদিকদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন। এর ফলে পুলক চট্টোপাধ্যায়ের মতো অসংখ্য বরিষ্ঠ সাংবাদিক চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক দেউলিয়া হয়েছেন, যা তাঁদের পরোক্ষভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব পর্যন্ত অবরুদ্ধ (Freeze) করা হয়, যা তাদের ও তাদের পরিবারের বেঁচে থাকার ন্যূনতম পথকেও রুদ্ধ করে দেয়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালন বা কলাম লেখার অপরাধে বহু সাংবাদিক বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলায় তাঁদের দিনের পর দিন জামিন না দিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত এবং একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল বাবুর মতো বরিষ্ঠ সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর মামলা চাপানো হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো সংস্থায় হাজির করে রিমান্ডের নামে মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। এটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়াকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সবচেয়ে অমানবিক দিকটি হলো, কারাগারে বন্দি এই সাংবাদিকদের মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। গুরুতর অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও অনেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে কারাগারে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা, বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনা করে ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধা বা মানবিক আচরণ থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে—যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে ধীর গতির 'হত্যাকাণ্ডের' সমান।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তা পরিমাপ করা হয় সেই দেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনতার সূচক দেখে। কণ্ঠরোধ ও ভীতি প্রদর্শনের এই নোংরা রাজনৈতিক খেলা বন্ধ না হলে, বাংলাদেশ এক সময় সম্পূর্ণ ভিন্নমতহীন এবং ফ্যাসিবাদের এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবে—যা কোনো সচেতন নাগরিকেরই কাম্য নয়।
চাই কাঠামোগত সংস্কার, উপরোক্ত নামগুলো স্রেফ অপরাধের খতিয়ান বা কাকতালীয় কোনো ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার জন্য চলমান একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্র সাংবাদিকদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অর্থনৈতিক শোষণের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না।
















