সাহিন আরা সুলতানা 
রাজনৈতিক-সমাজকর্মী, বাংলাদেশ
একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের সার্বজনীনতা। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, অপরাধের ধরণ দেখে তার বিচার নিশ্চিত করাই আইনের শাসন। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে 'সিলেক্টিভ সিমপ্যাথি' বা বেছে বেছে সহানুভূতি দেখানোর এক ভয়াবহ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যায় বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে সোচ্চার না হয়ে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, স্বার্থ বা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা নীরব থাকার এই সংস্কৃতি সমাজকে এক চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সম্প্রতি ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে (Venice International Film Festival) বাংলাদেশের (Bangladesh) সিনেমাকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লিগের কর্মী ও সমর্থকরা আজমেরী হক বাঁধনকে (Azmeri Haque Badhon) 'জুলাই জঙ্গি' আখ্যা দিয়ে গায়ে ডিম, নরম পানীয়র ক্যান ছুড়ে মারা হয় এবং  'জয় বাংলা' স্লোগান দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। বিদেশের মাটিতে একজন নারী এবং দেশের একজন শিল্পীর সাথে হওয়া ঘটনায় জুলাই পন্থী লোকজন এবং শিল্পীরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে এই নিন্দার পিছনেও লুকিয়ে আছে এক গভীর স্ববিরোধিতা।

অভিনেত্রী বাঁধনের উপর হামলার পর পুরো রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজ যেভাবে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং প্রতিটি নাগরিকেরই এই নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বিগত দুই বছরে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর ঘটে যাওয়া অবর্ণনীয় খুন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সময় এই সামগ্রিক ক্ষোভ কোথায় থাকে? গত দুই বছর ধরে দেশের প্রতিটি প্রান্তে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং মব জাস্টিসের নামে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মহোৎসব চলছে। পথে-ঘাটে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে কতশত সাধারণ মানুষ বিচারহীনভাবে খুন হচ্ছেন, কত নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে নির্বাক হয়ে যাচ্ছেন। গণমাধ্যমের পাতায় সেই খবরগুলো কেবলই কিছু পরিসংখ্যান হয়ে ঝুলে থাকে। যখন একজন প্রভাবশালী বা সেলিব্রিটি আক্রান্ত হন, তখন প্রতিবাদের যে ঢেউ ওঠে, তা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বেলায় স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই বেছে বেছে প্রতিবাদ বা 'সিলেক্টিভ আউটরেজ' প্রমাণ করে যে, আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য আর প্রভাবশালীদের জীবনের মূল্য এক নয়।

অভিনেত্রী বাঁধনের উপর হামলার পর সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ক্ষোভ ও অসন্তোষও দেখা গিয়েছে যে, তিনি একটা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লিগ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থক ছিলেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। ফলে যখন ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের তথাকথিত আন্দোলনে তিনি হঠাৎ করেই নিজের অবস্থান বদলে আওয়ামী লিগের বিপক্ষে দাঁড়ান, তখন অনেকেই একে রাজনৈতিক ‘সুবিধাবাদ‘ বা ‘অকৃতজ্ঞতা‘ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যারা তাকে একসময় সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখেছেন, তাদের কাছে এই ভোলবদল নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। 

মানবাধিকারের সার্বজনীনতা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় যখন কোনও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরাজিত পক্ষের নারীদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং সমাজ তা দেখেও না দেখার ভান করে। বিগত দুই বছরে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লিগের নারী কর্মী, সমর্থক বা নেতাদের উপর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে শারীরিক লাঞ্ছনা, মব হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে—তা সভ্য সমাজের জন্য এক চরম কলঙ্ক । 

শুধু ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের অংশ হওয়ার কারণে বা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মতো জায়গায় শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার অপরাধে মায়েদের বয়সী প্রবীণ নারীদের উপরও নির্মম গণহামলা চালানো হয়েছে। একজন নারী যখন রাজনৈতিক কারণে বিবস্ত্র বা লাঞ্ছিত হন, তখন নারী অধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ হয় নীরবতা পালন করে, অথবা সেই অন্যায়কে একপ্রকার যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করে। অপরাধী বা অত্যাচারী যেই দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কিন্তু তার পরিবারের নারী বা সাধারণ কর্মীদের ওপর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মব জাস্টিস ও নির্যাতন চালানো কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না ।

যখন সমাজের একটি পক্ষ বাঁধনের ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানায় কিন্তু আওয়ামী লিগের নারীদের উপর হওয়া নির্যাতন নিয়ে চুপ থাকে, কিংবা অন্য পক্ষটি নিজেদের করা অপরাধকে আড়াল করে কেবল প্রতিপক্ষের অন্যায়কে বড় করে দেখায়—তখন মানবাধিকারের মূল ভিত্তিটিই ভেঙে পড়ে । এই খণ্ডিত সহানুভূতি সমাজকে চরমভাবে মেরুকৃত করে তোলে। এর ফলে কোনো পক্ষই প্রকৃত ন্যায়বিচারের দাবিদার থাকে না, বরং প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থের পরিপূরক অপরাধগুলোকে বৈধতা দিতে শুরু করে।

সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকটটি তৈরি হয় তখন, যখন নিজেকে ‘নারী অধিকার কর্মী‘ বা ‘বিপ্লবী‘ হিসেবে দাবি করা স্বয়ং অভিনেত্রী বাঁধনের মতো ব্যক্তিত্বরা সেই সময় এই প্রকাশ্য নারী অবমাননার বিরুদ্ধে কোনও জোরালো প্রতিবাদ বা নিন্দা জানাননি। এই ধরনের নীরবতা সাধারণ মানুষের মনে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে—মানবাধিকার বা নারীর আত্মমর্যাদার লড়াই কি তবে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে? 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে হামলার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পোশাক এবং অন্তর্বাস নিয়ে একদল মানুষের রাজপথে ও সামাজিক মাধ্যমে যে কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শন, নগ্ন উল্লাস এবং নোংরা স্লোগান ছিল—তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক । একজন রাজনৈতিক নেত্রীর দীর্ঘ শাসনের  সমালোচনা বা তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অধিকার যেকোনো নাগরিকেরই রয়েছে। কিন্তু একজন সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ নারীর ব্যক্তিগত পোশাক নিয়ে যে বিকৃত লালসা ও যৌনতাবাদী লাঞ্ছনা প্রদর্শন করা হয়েছিল, তা ছিল সরাসরি নারী অবমাননা। আজমেরী হক বাঁধন কিন্তু চুপ ছিলেন তখন।

আজ ইতালির (Italy) মাটিতে যখন বাঁধনের উপর হামলা হয়, তখন তা যদি নারীর অবমাননা হয় ঠিক তেমনই সেদিন রাষ্ট্রের একজন শীর্ষস্থানীয় নারীর অন্তর্বাস নিয়ে যারা প্রকাশ্য রাস্তায় নোংরামি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধেও সমভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করা উচিত ছিল। অন্যায়ের এই দ্বিমুখী মূল্যায়নই আমাদের সুশীল সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আজ জনমনে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 

যতদিন পর্যন্ত আমরা অপরাধীর দলীয় পরিচয় বা ভুক্তভোগীর সামাজিক মর্যাদা দেখে প্রতিবাদের ভাষা নির্ধারণ করব, ততদিন সমাজে প্রকৃত শান্তি বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের 'সিলেক্টিভ সিমপ্যাথি'র দেয়াল ভেঙে সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমস্বরে সোচ্চার হতে হবে।