লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি আর সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য-সঙ্কটের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। একদিকে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা, অন্যদিকে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ— এই দ্বিমুখী ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে একধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমন উদ্বেগজনক তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে।

সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অগস্টে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় আড়াই পয়েন্ট বেড়ে ১৩৩.৩ পয়েন্টে ঠেকেছে। খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি থেকে শুরু করে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য— আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি সামগ্রীর দামই এখন ঊর্ধ্বমুখী। ইউরোপে নজিরবিহীন দাবদাহ ও খরা, এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে এল নিনোর দোলাচল এবং ইউক্রেন ও ইরান ঘিরে সামরিক উত্তেজনা কৃষিপণ্যের জোগানে বড়সড় ফাঁক তৈরি করেছে। তথ্য বলছে, অগস্টে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক ২.২ শতাংশ বেড়ে চব্বিশ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের দাম ছুঁয়েছে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ শিখর। চিনির দামেও প্রায় ১২ শতাংশ উল্লম্ফন ঘটেছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববাণিজ্য এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে বলে সতর্ক করেছেন এফএও-র প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো।

উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস ৩.৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কমিয়ে ২.৯৮০ বিলিয়ন টনে নামিয়ে এনেছে রাষ্ট্রসংঘের সংস্থাটি। এর ফলে গত বছরের তুলনায় উৎপাদন প্রায় ২ শতাংশ কমতে পারে, যা গত প্রায় আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্যের জোগান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্ঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে রাসায়নিক সারের জোগান ব্যাপকভাবে ধাক্কা খেয়েছে।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ায় কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহণ খরচ মাত্রাছাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে বহু গুণ। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সঙ্কটের সরাসরি আঁচ পড়বে খাদ্য সুরক্ষায়। আমদানি-নির্ভর দেশগুলিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ চরমে পৌঁছাবে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে গোটা দুনিয়া এক অভূতপূর্ব অনাহারের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।