যুদ্ধের আঁচে যখন বিশ্বজুড়ে সংকটে জ্বালানি থেকে বাণিজ্য, বদলে যাচ্ছে অনেক সমীকরণ। তখনই কূটনীতির ময়দানে বড়সড় বার্তা দিল ভারত (India)। ব্রিকস সম্মেলনের (BRICS Summit) মঞ্চে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) সঙ্গে বৈঠকে বসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। প্রতিরক্ষা থেকে জ্বালানি, বাণিজ্য থেকে প্রযুক্তি। দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও মজবুত করার পথ নিয়েই বিস্তর আলোচনা হল সম্মেলনে।
আরও পড়ুন: ক্ষমতায় এসেই উল্টো সুর! টেটের কোপে ৯০ হাজার কর্মরত শিক্ষক, প্রশ্নের মুখে বিজেপির প্রতিশ্রুতি
বৈঠকের শুরুতেই পুতিনকে প্রখ্যাত তামিল কবির একটি বই উপহার দেন মোদি। তবে সৌজন্য পর্ব পেরিয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা কার্যত স্পষ্ট। বিশেষ করে জ্বালানি নিয়ে দিল্লি-মস্কোর বোঝাপড়া নজর কেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত। সূত্রের খবর, ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এক হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করতে আগ্রহী দুই দেশ।
এর মধ্যেই অবশ্য রয়েছে ওয়াশিংটনের চাপ। রাশিয়া থেকে ভারতীয় তেল কেনা নিয়ে অতীতে একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। শুল্কনীতি নিয়েও দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। সেই আবহে পুতিনের সঙ্গে মোদির বৈঠককে নিছক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হিসেবে দেখছেন না কূটনীতিকদের একাংশ। বরং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকাকে স্পষ্ট বার্তা দিল নয়াদিল্লি। বিদেশনীতি নির্ধারণে নিজের প্রয়োজন ও স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে ভারত।
আরও পড়ুন: নজরে পড়ুয়াদের ভবিষ্যত: প্রধান শিক্ষক হেনস্থায় অভিযুক্তদের শুধু TC-র নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর
প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রুশ যুদ্ধবিমান সুখোই এসইউ-৫৭ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। পাশাপাশি ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান সুখোই-৩০ এমকেআই-এর আধুনিকীকরণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সঙ্গে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ এবং প্যান্টসির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবর।
অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এসেছিল। আর তার পরেই ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়াতে রাশিয়ার প্রযুক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে দিল্লির নজর থাকা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির বড় অংশ ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও জানা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, আমেরিকার সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ছবিটিও এই মুহূর্তে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন সফরের সময় মোদিকে এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। কিন্তু তার পরেও রুশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে ভারতের আগ্রহ কমেনি। ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুই মেরুর সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে এগোনোর কৌশলই যে দিল্লি বজায় রাখতে চাইছে, তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
পুতিনের সঙ্গে মোদির এই বৈঠক অবশ্য একেবারে নতুন নয়। সম্প্রতি বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের ফাঁকেও দু’জনের সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই সময় ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা রুশ প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন মোদি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও মস্কোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না ভারত।
এবার ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ভারত (India), রাশিয়া (Russia) এবং চিন (China), এই তিন বড় শক্তির একই মঞ্চে উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমেরিকা-নির্ভর বিশ্বব্যবস্থার বাইরে শক্তির ভারসাম্যে নতুন কোনও সমীকরণ তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকেই এখন নজরে গোটা বিশ্বের।
















