স্বপ্নের কোনও নির্দিষ্ট বয়স হয় না আর সেই সত্যিটাই যেন প্রতিদিন নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন হাওড়ার মহিলা বাস ব্যবসায়ী ও কন্ডাক্টর ডলি রানা (Bus Owner and conductor Dolly Rana)। ষাটের কাছাকাছি বয়সেও প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাসের কাজে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সমাজের প্রচলিত ধারণা কোনও কিছুই তাঁকে নিজের লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। ডলি রানার লড়াই আজ আর শুধু তাঁর একার নয়। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি বহু নারীর কাছে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

ডলি রানার বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে, দৈনন্দিন খরচ সামলানোর পর বড় কোনও সঞ্চয়ের সুযোগই থাকত না। কিন্তু তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল একদিন নিজের নামে একটি বাস থাকবে। বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে পূরণ করার চেষ্টা করেন তিনি নিজেই। নিজের গয়না বিক্রি, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় এবং ঋণের সাহায্যে প্রায় সাত লক্ষ টাকা জোগাড় করে তিনি একটি বাস কেনেন। সেই মুহূর্তেই শুধু বাবার ইচ্ছা পূরণ হয়নি, শুরু হয়েছিল ডলির জীবনের নতুন অধ্যায়ও।

করোনার (Corona Virus) আগে পর্যন্ত নিজের বাসের পরিষেবা চালাতে চালক ও কন্ডাক্টরের উপরই ভরসা করেছিলেন ডলি রানা। কিন্তু লকডাউনের ধাক্কায় দীর্ঘদিন বাস বন্ধ থাকায় ব্যবসায় বড়সড় ধস নামে। পরে বাস চলাচল শুরু হলেও যাত্রীসংখ্যা এতটাই কমে যায় যে প্রতিদিনের আয় দিয়ে কর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পর তেলের খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কঠিন সময়ে ব্যবসা বাঁচাতে নিজেকেই সামনে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আর পিছন ফিরে তাকাননি। অন্য কাউকে কন্ডাক্টরের দায়িত্ব না দিয়ে নিজেই টিকিটের ব্যাগ কাঁধে তুলে নেন। বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন যাত্রীদের টিকিট (Ticket) কাটা থেকে শুরু করে সমস্ত দায়িত্ব সামলাতে থাকেন। শুরুতে নতুন অভিজ্ঞতা হওয়ায় কিছুটা সংকোচ থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর বাবার স্বপ্নের বাসকে চলার পথে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

সময়ের সঙ্গে আরও এক বড় বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। নির্ধারিত ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ায় পুরনো বাসটি আর রাস্তায় নামানো যায়নি। কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও থেমে থাকেননি ডলি। আবার নতুন করে শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ করে নতুন বাস কেনেন। এখন সেই বাস একই রুটে চলছে। সামনে বড় ঋণ শোধ করার দায়িত্ব থাকলেও ভবিষ্যতে আরও বাসের মালিক হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।

আজও ডলি রানার দিন শুরু হয় ভোর ৪টেয়। চালক (Driver) ও সহকারীকে নিয়ে প্রতিদিন বাস নিয়ে রওনা দেন, আর বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়। ব্যস্ততার কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটানোর সুযোগ না থাকলেও নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে তাঁর এক আলাদা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ডলির কথায়, স্বপ্নপূরণের পথে বাধা আসবেই। কিন্তু সেই বাধার কাছে হার মানলে কোনও লক্ষ্যই পূরণ হয় না। যতদিন কাজ করার শক্তি থাকবে, ততদিন নিজের বাসেই কন্ডাক্টরের দায়িত্ব পালন করব। এই পেশার পরিশ্রমই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।