বিশ্বকর্মা পুজোর আবহে যখন কারিগরি ও যন্ত্রের বন্দনায় মাতোয়ারা গোটা বাংলা, তখন কলকাতার রাজপথে এক জীবন্ত ‘বিশ্বকর্মা’ নিজের দক্ষতায় রোজ ভাঙছেন সামাজিক স্টিরিওটাইপ। চিরাচরিত পুরুষপ্রধান পেশার গণ্ডি ভেঙে পার্ক সার্কাসের ফুটপাতে মোটরবাইক মেরামতের কাজ করে নজির গড়েছেন সোনালি মিস্ত্রি। পেটের তাগিদে শুরু হলেও আজ তিনি শহরের বাইকচালকদের কাছে আস্থার অপর নাম। 

অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ স্কুলের প্রাক্তনী সোনালির জীবনের মোড় ঘোরে বাইক মেকানিক আবদুল কালামের সঙ্গে পরিচয়ের পর। প্রেমের বিয়ে। সংসারের প্রয়োজনে স্বামীর কাজের জায়গাতেই হাত লাগাতে শুরু করেন তিনি। স্বামীর কাছেই হাতেখড়ি— বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ইঞ্জিনের জটিল কারিকুরি, চাকা খোলা থেকে শুরু করে পার্টস জোড়ার কৌশল— সবই নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করে নেন সোনালি। 

পরবর্তীকালে স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতীর উপদ্রবে স্বামীকে এলাকা ছাড়তে হলে জীবিকার তাগিদে পুরো গ্যারাজের হাল নিজের কাঁধেই তুলে নেন তিনি। শুরুতে একজন মহিলাকে বাইক সারাতে দেখে পথচলতি ও গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র সংশয় ও দ্বিধা ছিল। অনেকেই ভরসা করতে পারতেন না। কিন্তু নিজের নিষ্ঠা ও নিখুঁত কাজের জোরে অল্প দিনেই সেই ভুল ভেঙে দেন সোনালি। 

আজ দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে পার্ক সার্কাসের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সমান দক্ষতায় বাইক সারাই করে চলেছেন তিনি। ইঞ্জিনের বিকট শব্দ কিংবা মোবিলের কালির দাগ— কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে টলাতে পারেনি। মহিলা মানেই দুর্বল— এই প্রচলিত ধারণাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে এখন যেকোনো জটিল বাইক সমস্যার নিমেষে ‘মুশকিল আসান’ তিনি। এলাকার বহু চালক এখন চোখ বন্ধ করে নিজের প্রিয় বাইকটি সঁপে দেন এই অপরাজেয় কারিগরের হাতে।