সিনেমা মানে বাস্তব নয়, কিন্তু কখনও কখনও যেন সে বাস্তব জীবনের নানা চরিত্রের সঙ্গে অবলীলায় বিলীন হতে পারে। এ কাজ সহজ নয় কিন্তু দশকের পর দশক কিংবা যুগের পর যুগ যিনি সাবলীলভাবেই দর্শকের মনের মনিকোঠায় স্থায়ী জায়গা করে নিতে পেরেছেন তিনি শুধু অতি উত্তম নন, তিনি যে সর্বকালীন সেরা, এটা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাইতো আজও ভুবন ভোলানো হাসি আর আইকনিক ধুতি পাঞ্জাবির ক্যারিশমা জনপ্রিয়তার নিরিখে হাপিয়ে যায় অতীতের সব রেকর্ড কিংবা বর্তমানের পরিসংখ্যানকে। আজ ৩ সেপ্টেম্বর। বছরের হিসেব বলছে সালটা ২০২৬। অর্থাৎ উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। তাই আজ আরও একবার ছাপোষা অরুণের 'উত্তম' হয়ে ওঠার যাত্রাপথের স্মৃতিচারণা আর চর্চা দিনভর তাঁর সতীর্থ থেকে অনুরাগীদের মনে। 

সাদাকালো সিনে ক্যানভাসের 'হৃদয় হরণ' খুব সহজে তাঁর স্বপ্নের পথে পা বাড়াতে পারেননি। বাস্তবের 'দেয়া নেয়া'র হিসেব মেলাতে হয়েছিল তাঁকে। তবু আটপৌরে বাঙালির প্রিয় 'কৃষ্ণেন্দু' জীবনের চড়াই-উতরাই বাঁক পেরিয়ে হাল ছাড়েননি। সেই কারণেই হয়তো ব্যক্তিগত জীবনের একাধিক বিতর্ককে সঙ্গী করে আদর্শ পুরুষ না হলেও সব মনের আকাঙ্ক্ষিত 'মহানায়ক' হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। হলিউড তারকাদের অভিনয় দেখতে দেখতে অরুণের মনে জেগে ছিল অভিনয়ের নেশা। অফিস করে সন্ধ্যেবেলা কখনো থিয়েটার কিংবা চৌরঙ্গীপাড়ার সাহেবি হলে সিনেমা দেখা তো ছিলই, কিন্তু এবার জেদ চাপল নিজেকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু চাইলেই কি সব চাওয়া শুরুতেই পাওয়া যায়? এক্সট্রা চরিত্রে প্রথম ছবি 'মায়াডোর' পৌঁছল না দর্শকের কাছে। হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি। ১৯৪৮ সালে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'দৃষ্টিদান'। এবারও ম্যাজিক হল না। কেতকী দত্ত বিখ্যাত হলেন, আর উত্তমের কপালে বঞ্চনা। হাতে পেলেন মাত্র সাড়ে ১৩ টাকা। এর পরবর্তী তিন বছরে অন্তত ছয় থেকে সাতটা ছবি হলেও কোনটাই দর্শকের কাছে সেভাবে পৌঁছে দিতে পারল না চট্টোপাধ্যায় পরিবারের উদীয়মান তারকাকে। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল 'বসু পরিবার'। নির্মল দে পরিচালিত এই ছবির অন্যতম অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে উত্তম মানে আজও প্রেমের আবেশ। শতবর্ষেও তিনি জীবন্ত, বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর মনে। সাবিত্রীর কথায়, 'মহানায়কের প্রয়াণের প্রায় সাড়ে চার দশক পরে বৃষ্টি ভেজা দিনে এত স্মৃতিচারণ সত্যিই মনকে ভারি করে তোলে। উত্তমদার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সবসময়ই মনে রাখার মতো।আমাদের নির্দিষ্ট কোনও ‘জুটি’ না থাকলেও, অনেকগুলো কাজ করেছি একসঙ্গে। সত্যিকারের জাত অভিনেতা ছিলেন, যিনি প্রতিটি চরিত্র বুঝে অভিনয় করতেন। আমি আজও বিশ্বাস করতে পারি না উনি নেই। উনি আমার কাছে জীবন্ত।' 

শুধু জুলাই মাস কিংবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ নয়, উৎসবে বা একাকিত্বে, প্রেম বা বিরহে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রত্যেক বাঙালি পরিবারের সদস্যদের কাছে উত্তম এক মন ভালো করা আশ্রয়স্থল। তাইতো তিনি কখনও অতীত হতে পারেন না, এমনটাই মনে করেন পদ্মশ্রী অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘বাঙালি’ বললেই পৃথিবী জুড়ে মানুষের মনে যে ক’টি ছবি ভেসে ওঠে, উত্তম কুমার তার মধ্যে অন্যতম, শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবেও। কারও কাছে বাবা-মায়ের দেখা সিনেমার নায়ক, কারও কাছে শৈশবের রবিবারের দুপুর, কারও কাছে প্রথম প্রেমের মুখ, আবার কারও কাছে অভিনয়ের এক অসাধারণ পাঠ। প্রত্যেক প্রজন্ম তাঁকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছে।'

সত্যিই তো, শুধুই কি নস্টালজিয়া দিয়ে একজন অভিনেতাকে এত বছর মনে রাখা যেত? আসলে যিনি কখনও নিখাদ প্রেমিক কিংবা অহংকারী তারকা, তিনিই যে সাধারণ মধ্যবিত্তের মতো ক্লান্তি ও একঘেয়েমি কাটিয়ে কখন বাঙালির আবেগের চিরকালীন 'নায়ক' হয়ে উঠলেন, তাঁর কথা মাত্র কয়েকটি শব্দ ব্যবহারে ফুটিয়ে তোলা কার্যত অসম্ভব। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বলছেন, উত্তম কুমার আমাদের অনুপ্রেরণা। তাই তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েই আমাদের মনে রাখা উচিত। জিৎ কিংবা দেবের মতো এই মুহূর্তের টলিউড হিরোরা আরও অনেক কিছু শিখতে চান মহানায়কের কাছ থেকে। আসলে চরিত্রের উপর নিজের স্টারডম ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার যে অসম্ভব ক্ষমতা ছিল উত্তমের মধ্যে তা আগামী কয়েক শতকেও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই উত্তম চর্চা ও গবেষণা, বিতর্ক ও আলোচনা, ভালোবাসা ও অল্পবিস্তর সমালোচনা চলতেই থাকবে। আর প্রতিবার বাংলার সিনে দর্পণে প্রতিফলিত হবে সেই ব্যক্তিত্ব যিনি অনায়াসের টেবিল চাপড়ে বলতে পারেন, "আই ওয়ান্ট টু গো টু দ্য টপ টপ টপ"। 

সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, বদলে যায় সরকার। তবুও পরিবর্তনশীল মানসিকতার বাঙালি সাম্রাজ্যে একই গরিমা নিয়ে 'উত্তম নিশ্চিন্তে চলে'... আজীবন।