আরএসএস (RSS) এবং হিন্দু মহাসভা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। মুসলিম লিগের সদস্য ফজল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা)। গান্ধীজী যখন “ভারত ছাড়ো” স্লোগান তোলেন, তখন শ্যামাপ্রসাদ ১৯৪২ সালের ৯ অগাস্ট সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সমীচীন মনে করেননি। আর আজ তারাই দেশ ভক্তির পাঠ দিচ্ছে! লিখছেন দেবলীনা মুখোপাধ্যায় ।
প্রতিপত্তিকামী বিজেপির কাছে স্বাধীনতার গুরুত্ব কতটা
Sponsored

বিজেপি (BJP) ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ (সবার সাথে এবং সবার জন্য উন্নয়ন) এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ক্ষমতায় এসেছিল। এই স্লোগানটি মানুষের কাছে কী অর্থ বহন করে? তারা আশা করে যে সরকার বিভিন্ন উপায়ে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে, যার মধ্যে রয়েছে জনকল্যাণমূলক সামগ্রী সরবরাহ, স্বাস্থ্য সুবিধা, আর্থিক ও বস্তুগত সহায়তা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সম্প্রসারণ। যদিও দল হিসেবে বিজেপি গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্রকে তার পাঁচটি পথনির্দেশক নীতির অন্যতম হিসেবে প্রচার করে, তাদের প্রশাসনিক পর্যায়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং নীতি নির্ধারকদের মধ্যে প্রভাবশালী প্রবণতাটি হলো বেপরোয়াভাবে সমাজতন্ত্রের উপাদানগুলোকে বর্জন করা এবং ভারতকে রাষ্ট্র ও বাজারের একটি স্বাধীনতাবাদী প্রতিমান বা প্যারাডাইমের দিকে আগ্রাসীভাবে ঠেলে দেওয়া। গণতন্ত্র মানেই হলো ব্যক্তিগত কল্যাণ এবং একটি উন্নত জীবনের জন্য সুযোগের ন্যায্য অধিকার। এই নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি কি জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অপরিহার্যতার মধ্যেকার ভারসাম্যকে নষ্ট করে না?
বিজেপি একটি প্রভাবশালী দল। স্পষ্টতর ভাষায় প্রতিপত্তিকামী একটি দল। অনেকে বলেন, একদলীয় আধিপত্যের ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে গণ্য না করে, গণতন্ত্রেরই একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিজেপি এটা করতেই ইচ্ছুক। কিন্তু মুশকিল হল, প্রভাবশালী দলীয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। গণতন্ত্র দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদলের ওপর নির্ভরশীল এবং পরাজিত দলের পরবর্তী নির্বাচনে পর্যাপ্ত জনসমর্থন জোগাড় করে জেতার আশার ওপরও নির্ভর করে। যদিও শাসন করার আকাঙ্ক্ষা সকল রাজনৈতিক দল ও নেতার মধ্যেই সহজাত, অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। চরম পর্যায়ে পৌঁছালে, এর ফলে অন্যান্য দলগুলোকে স্থায়ী বিরোধী দলের পর্যায়ে নামিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা অথবা সেই সেকেলে প্রভাবশালী দলীয় ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা জন্ম নিতে পারে, যেখানে শাসক দল জাতির ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে। আর আজকের বিজেপি ঠিক এটাই করছে।
আজকের বিজেপিকে রাজ্য পর্যায়ে তীব্র দলীয় প্রতিযোগিতা এবং দলীয় প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধরনের বাস্তবতার সাথে মানিয়ে চলতে হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন দলের আধিপত্য রয়েছে এবং তাদের সবাইকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়, এটা বিজেপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, বিজেপির পক্ষে সিঙ্গাপুরের পিপলস অ্যাকশন পার্টি বা দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মতো হয়ে ওঠা সম্ভবও নয়, কাম্যও নয়।
এবার আসুন এই স্বাধীনতা দিবসে বুঝে নিই, কেন বিজেপি ওই পর্যায়ের হতে পারবে না বা সেটা কাম্যও নয়। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “রাষ্ট্র ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে আইনের দৃষ্টিতে সমতা অথবা আইনের সমান সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করবে না।” কিন্তু, আরএসএস-এর প্রধান তাত্ত্বিক এম এস গোলওয়ালকর তাঁর ‘আমরা, অথবা আমাদের জাতিসত্তার সংজ্ঞা’ (১৯৩৮) বইয়ে যা লিখেছেন তা হল : “হিন্দুস্তানের অ-হিন্দুদের হয় হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে হবে… অথবা তারা হিন্দু রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অধীনস্থ হয়ে দেশে থাকতে পারে, কোনো দাবি না করে, কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য না হয়ে, বিশেষ সুবিধা তো দূরের কথা, এমনকি নাগরিক অধিকারও নয়।” এই বইটি আরএসএস সদস্য ও অনুসারীদের অর্থাৎ বিজেপির আদর্শগত উৎস। সত্যি কথা বলতে কী, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হলো আরএসএস-এর সংসদীয় শাখা মাত্র। এর অধিকাংশ নেতা, যাঁরা এখন প্রধানমন্ত্রী বা অন্যান্য মন্ত্রীর মতো সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত, তাঁরা আরএসএস-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। যদিও এটি একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে, আরএসএস আসলে মূল রাজনৈতিক সংগঠন, যেখান থেকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ধারণাটির উৎস প্রবাহিত হয় এবং বিজেপি ইত্যাদির মতো তার বিভিন্ন শাখাকে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য নির্দেশ দেয়।
যদিও আরএসএস ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, জাতীয় আন্দোলনে এর কোনো নায়ক নেই, কারণ তারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না।তাদের অন্যতম আদর্শ হলেন হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা ভি ডি সাভারকর, যেখান থেকে আরএসএস বিভক্ত হয়েছিল। ২০০২ সালে, গুজরাটের গণহত্যার দুই মাস পর, প্রথম এনডিএ সরকার তাঁর নামে আন্দামান বিমানবন্দরের নামকরণ করে। ভগত সিং, সুখদেব এবং আশফাকুল্লাহর মতো অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের থেকে ভিন্ন, যাঁরা জীবনের বিনিময়েও ব্রিটিশ রাজের কাছে ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেছিলেন, সাভারকর আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দী থাকাকালীন প্রকৃতপক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। ১৯১৩ সালের ১৪ই নভেম্বর তারিখে ক্ষমা চেয়ে লেখা তাঁর চিঠিতে, তিনি নিজেকে একজন ‘পথভ্রষ্ট পুত্র’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, যিনি ‘সরকারের পৈতৃক দরজায়’ ফিরে আসার জন্য আকুল ছিলেন।আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। মুসলিম লিগের সদস্য ফজল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (বিজেপির পূর্বসূরি জন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা)। গান্ধী যখন “ভারত ছাড়ো” স্লোগান তোলেন, তখন মুখার্জি ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগ করা সমীচীন মনে করেননি। বরং, তিনি নিম্নলিখিত প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন - “প্রশ্ন হলো, বাংলায় এই (ভারত ছাড়ো) আন্দোলনকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়? প্রদেশের প্রশাসন এমনভাবে চালানো উচিত, যাতে কংগ্রেসের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই আন্দোলন প্রদেশে শিকড় গাড়তে ব্যর্থ হয়... ভারতীয়দের ব্রিটিশদের ওপর আস্থা রাখতে হবে, ব্রিটেনের স্বার্থে নয়, ব্রিটিশদের কোনো সম্ভাব্য লাভের জন্যও নয়, বরং খোদ প্রদেশের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই।” বস্তুত, তাঁরা ১৯৪২ সালের ৩১শে আগস্ট একটি প্রস্তাবও পাশ করেন, যেখানে মহাসভার সকল সদস্যকে তাঁদের পদে বহাল থাকতে এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করতে বলা হয়।এর পরেও এরা স্বাধীনতা দিবসের দিন বড় বড় কথা বলে কোন মুখে!
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













