নাম এবং প্রতীক নিয়ে গোলমালের জেরে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে বৈঠক করে তৃণমূলের দুই শিবির। শনিবার, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী আলাদা করে দু’শিবিরে সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ জানান, “আমাদের কাছে কোনও নতুন নথি চাওয়া হয়নি। আমরা মাত্র একটি নথি জমা দিয়েছি।"

কী ছিল সেই নথিতে? পাওয়া গেল রাতে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সচিবকে লেখা চিঠিতে মমতাপন্থী তৃণমূলের তরফে তথ্য দিয়ে লেখা হয়েছে,

"নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার সময় আমরা জানিয়েছি যে, ২০০৬ সাল থেকেই আমাদের দলীয় সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (এআইটিসি) ও জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর করা হয়েছিল। এআইটিসি-র ২০১০-১১ সালের সংবিধান সংক্রান্ত ভারতের নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইট দেখলেই এটি স্পষ্ট বোঝা যাবে, যার ৯(ক) নম্বর ধারায় পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিটি কমিটি, তার পদাধিকারী, কার্যনির্বাহী সমিতি এবং সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর হবে। সুতরাং, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকেই স্পষ্ট যে এআইটিসি এবং জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ৫ বছর, ৩ বছর নয়।

২০১৫ সালের ১ জুন ভারতের নির্বাচন কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি স্মারক সংখ্যা 56/Org/2015-PPS-11/143 মারফত এআইটিসি-র সভানেত্রীকে জানান যে, সাংগঠনিক নির্বাচন সংক্রান্ত যে তথ্য সভানেত্রী জমা দিয়েছেন, তা কমিশনের নির্ধারিত বয়ান অনুযায়ী দেওয়া হয়নি। তাই ভারতের নির্বাচন কমিশনের তরফে সভানেত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে এআইটিসি-র সাংগঠনিক নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য নির্দিষ্ট বয়ানে একটি সিডি সহ (সফ্‌ট কপি) ২০১৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে জমা দেওয়া হয়, যা ইমেলেও পাঠানো যেতে পারে।

২০১৫ সালের ৮ জুন এআইটিসি-র সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বক্সী আন্ডার সেক্রেটারিকে জানান যে, ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এআইটিসি সভানেত্রীর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি চিঠি জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় কর্মসমিতির সমস্ত সদস্য ও অন্যান্য পদাধিকারীদের নাম উল্লেখ ছিল। ওই চিঠি ও সিডির অনুলিপি ২০১৫ সালের ৮ জুনের চিঠির সঙ্গে পুনরায় পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে ৮ জুনের চিঠির সঙ্গে দলীয় সংবিধানের একটি অতিরিক্ত কপিও সংযুক্ত করা হয়েছিল। চিঠিটি ২০১৫ সালের ৮ জুন ভারতের নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করে। 

চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, "২০১৫ সালে দলীয় সংবিধান নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে দলীয় পদাধিকারীদের ৫ বছরের মেয়াদের কথা স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, তবুও তা পাওয়ার পরেও নির্বাচন কমিশন সেই সংশোধিত সংবিধান তাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করেনি।"

চিঠির দাবি অনুযায়ী, "২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর আন্ডার সেক্রেটারি তাঁর স্মারক সংখ্যা 56/Org/LET/FUNC/PPS-II/2017/Vol. 1/559 মারফত এআইটিসি সভানেত্রীকে জানান যে, ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল এআইটিসি-র জমা দেওয়া সাংগঠনিক নির্বাচনের তথ্য খতিয়ে দেখে দেখা গিয়েছে সেখানে কেবল সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের নাম রয়েছে। তাই ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দলের অন্যান্য পদের সাংগঠনিক নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এআইটিসি সভানেত্রী জাতীয় কর্মসমিতি ও অন্যান্য পদাধিকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং সেখানে গৃহীত প্রস্তাবের প্রতিলিপি পাঠান। গৃহীত প্রস্তাব এবং আমাদের পাঠানো চিঠিটি নির্বাচন কমিশনের দফতরে রেকর্ডভুক্ত করা হয়।

২০২২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এআইটিসি-র ২০২২ সালের সাংগঠনিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনের সচিব জয়দেব লাহিড়ীকে এআইটিসি এবং জাতীয় কর্মসমিতির নির্বাচিত সদস্যদের বিশদ বিবরণ জানান এবং উল্লেখ করেন যে শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এআইটিসি-র সর্বভারতীয় চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই চিঠিটি ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কমিশন গ্রহণ করে। উপরে উল্লিখিত যাবতীয় চিঠিপত্র এর সঙ্গে সংযুক্ত করে পাঠানো হচ্ছে। এই সমস্ত চিঠিপত্র থেকেই পরিষ্কার যে এর জন্য সর্বসমক্ষে নোটিশ জারি করা হয়েছিল এবং দলের সমস্ত সাংসদ ও বিধায়ককে এআইটিসি-র সদস্য করা হয়েছিল। অথচ শ্রী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমা দেওয়া তথাকথিত প্রস্তাব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাবে যে দলীয় সংবিধানের নিয়ম মেনে সেখানে সমস্ত সাংসদ ও বিধায়ককে এআইটিসি-র সদস্য করা হয়নি।

আমরা আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই যে, ২০২৬ সালের ৯ মার্চ নির্বাচন কমিশন এআইটিসি-র যে সংবিধান গ্রহণ করেছে, তাতেও ঠিক একইভাবে ৫ বছরের মেয়াদের কথাই বলা হয়েছে, যা কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে থাকা ২০১০-১১ সালের দলীয় সংবিধানের ৯(ক) নম্বর ধারার সঙ্গে হুবহু এক।

এআইটিসি এবং জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনার প্রেক্ষিতেই উপরোক্ত তথ্যগুলি পেশ করা হল।"

আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে রয়েছে উপনির্বাচন। গণনা ৯ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর। সেই ভোটে জোড়াফুল প্রতীকে কারা লড়বে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। এই প্রেক্ষিতেই ‘তৃণমূল’ নাম, ‘জোড়াফুল' প্রতীক কাদের হাতে থাকবে, তার ফয়সালা করতে দিল্লি পৌঁছে গিয়েছিল দুই শিবির। ঋতব্রতরাও বেশ কিছু নথি জমা দেন। এখন কমিশন কী জানায় সেদিকেই নজর সকলের।