দেশের রাষ্ট্রপতির ( President) নিরাপত্তার দায়িত্ব মানেই চরম সতর্কতা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কোথায় যাবেন, কখন হাঁটবেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন অনেক কিছুই আগে থেকে নির্ধারিত থাকে। এমনকি তাঁর জন্য পরিবেশিত খাবার ও পানীয়ও থাকে নিরাপত্তা পরীক্ষার আওতায়। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ( Droupadi Murmu) প্রাক্তন এডিসি মেজর ঋষভ সিং সাম্বিয়াল ( Major Rishabh Singh Sambya) সম্প্রতি একটি পডকাস্টে ( Podcast) রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার নেপথ্যের নানা অজানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন।

আরও পড়ুন: সর্বকালের উষ্ণতম অগাস্ট, রেকর্ড গড়ে বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা

সাম্বিয়াল জানান, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও বিষয়কেই হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির শারীরিক দূরত্বও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণ ভাবে কাউকে রাষ্ট্রপতির হাত মেলানো বা পা ছোঁয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। কারণ, কোনও ব্যক্তি শুভেচ্ছা জানানোর অছিলায় আচমকা কী করবেন, তা আগে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। নিরাপত্তারক্ষীদের তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় অত্যন্ত সতর্ক ভাবে, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও অপমানিত না হন।

রাষ্ট্রপতির সফর বা কোনও অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও থাকে বিস্তারিত প্রস্তুতি। গাড়ি থেকে নামার পর কোন পথে হাঁটবেন, কোথায় দাঁড়াবেন, কার সঙ্গে ছবি তুলবেন এবং কোন পথে অনুষ্ঠানস্থল ছাড়বেন সবকিছুরই আগে থেকে মহড়া হয়। দিল্লির বাইরে সফর হলে রাষ্ট্রপতির শারীরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপরও থাকে। নিরাপত্তার আওতায় থাকা এলাকাও আগে থেকেই পরীক্ষা করে দেখা হয়। সাম্বিয়ালের দাবি, রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা নিরাপত্তার দিক থেকে খতিয়ে দেখা হতে পারে। মঞ্চ, বিদ্যুৎ সংযোগ, কার্পেট, ছাতা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানস্থলের বিভিন্ন সামগ্রীও পরীক্ষা করা হয়। কোনও অস্ত্র, ধাতব বস্তু বা সন্দেহজনক জিনিস যাতে নিরাপত্তার জন্য সমস্যা তৈরি না করে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর থাকে।

রাষ্ট্রপতির খাবার ও পানীয় নিয়েও রয়েছে কঠোর নিয়ম। পরিবেশনের আগে জল এবং খাবার পরীক্ষা করে দেখা হয়। ব্যবহৃত গ্লাস বা পাত্রেও কোনও সন্দেহজনক বস্তু রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। আবেদন, প্রয়োজনীয় যাচাই এবং অনুমোদনের পরেই সাধারণত সাক্ষাতের সুযোগ মেলে। ব্যক্তিগত কক্ষে অবাধ প্রবেশের কোনও সুযোগ থাকে না।

তবে এই দায়িত্বের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলির একটি ব্যক্তিগত জীবনকে পিছনে ফেলে আসা। রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিয়ে বা স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন বজায় রাখা কার্যত অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়, সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সফরের জন্য। সাম্বিয়াল জানিয়েছেন, ২০১৪ সাল থেকে বহুবার কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ফিরে আবার ছয়-সাত মাসের জন্য বাইরে থাকতে হয়েছে। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রপতির এডিজি থাকাকালীন বিয়ে করাও যায় না। তাই ঋষভ এখনও অবিবাহিত । 
রাষ্ট্রপতির এডিসি হওয়ার প্রক্রিয়াটিও যথেষ্ট কঠোর। সাম্বিয়ালের দাবি, প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৩০ জনকে বাছাই করে তাঁদের বয়স, কর্মজীবন, শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, গোপনীয় রিপোর্ট, পারিবারিক পরিচয় এবং আইনি তথ্য-সহ একাধিক বিষয় যাচাই করা হয়। সাক্ষাৎকারের সময়ও প্রার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এই দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণও নিতে হয়। সাম্বিয়াল জানিয়েছেন, বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষণে দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করা হয়। ভারী বোঝা বহন, শারীরিক ক্লান্তির মধ্যেও চারপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অস্ত্রচালনা এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাপ বা কুকুরের মতো পরিস্থিতি সামলানোর প্রশিক্ষণও এর অংশ হতে পারে।
পডকাস্টের শেষে সাম্বিয়াল জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। প্রায় তিন বছর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিশেষ। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, যেন নিজের মায়ের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।  রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্ব তাই শুধু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক থাকা, আগাম পরিস্থিতি আঁচ করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই এই কাজের  মূল চ্যালেঞ্জ। আর সেই দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে অনেক সময় নিজের স্বাভাবিক জীবন, পরিবার এবং ব্যক্তিগত পছন্দকেও দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। মেজর ঋষভ সিং সাম্বিয়ালের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সেই কঠোর বাস্তবতারই ছবি।