উৎসবের মরশুমে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মদের দোকান বন্ধের সরকারি ফরমান জারি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ যদি দীর্ঘ হয়, তবে তার প্রভাব কেমন হতে পারে? এমনই এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে মহারাষ্ট্র সরকারকে নজিরবিহীন ভর্ৎসনা করল বম্বে হাইকোর্ট। গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে পুনে জেলায় ১৩ দিনের জন্য মদ বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই আইনি জলঘোলা শুরু হয়। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, উৎসবের দোহাই দিয়ে এমন পাইকারি নিষেধাজ্ঞা (Blanket Ban) জারি করা যায় না।
আরও পড়ুন: সুরা-রসিকদের জন্য দুঃসংবাদ! পুজোর আগেই রাজ্যে বাড়ছে দাম
আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে চলেছে এবারের গণেশ উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পুনে জেলার জেলাশাসক এক নির্দেশিকায় প্রায় ১২ থেকে ১৩ দিন মদ বিক্রি ও পানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন পুনের প্রায় ৫৮ জন মদ ব্যবসায়ী ও হোটেল মালিকদের সংগঠন। তাঁদের দাবি ছিল, এভাবে হঠাৎ দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ রাখলে বিপুল আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
শুক্রবার এই মামলার শুনানির সময় বম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশ চন্দ্র ত্রিপাঠী এবং বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনা-র ডিভিশন বেঞ্চ পুনে প্রশাসনের এই নির্দেশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। আদালত প্রশ্ন তোলে, পুরো মহারাষ্ট্রের মধ্যে কেবল পুনে জেলাকেই কেন এভাবে টার্গেট করা হলো? মুম্বই বা অন্য কোথাও তো এমন নিয়ম নেই! এটা পুনের বাসিন্দাদের ওপর এক ধরণের অপবাদ বা কলঙ্ক লেপে দেওয়ার সামিল।
আরও পড়ুন: বিজেপির গোষ্ঠীকোন্দল প্রকাশ্যে! জেলা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন বিধায়ক রেখা
শুনানি চলাকালীন কিছুটা রসিকতার ছলে হলেও অত্যন্ত বাস্তব একটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন বিচারপতিরা। তাঁরা মন্তব্য করেন, “যাঁদের নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস রয়েছে (Habitual Drinkers), হঠাৎ করে টানা এতদিন মদ বন্ধ করে দিলে তাঁদের গুরুতর শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর ফলে মদ না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষদের ভিড়ে হাসপাতালগুলি রোগীতে উপচে পড়বে।”
সরকারি আইনজীবীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, উৎসবের দিনগুলিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে এবং অশান্তি এড়াতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দেয়। বেঞ্চের তরফে জানানো হয়, উৎসবের সময়ে মানুষ আনন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মদ্যপান করলেই সবাই রাস্তায় নেমে অশান্তি করবে, এমনটা ধরে নেওয়া ভুল। প্রশাসনকে আইনশৃঙ্খলার দিকটি কঠোরভাবে সামলাতে হবে, কিন্তু তার জন্য বৈধ লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের রুজি-রোজগার বন্ধ করা যায় না। তাছাড়া এর ফলে যেমন কালোবাজারি বাড়বে, তেমনই রাজ্য সরকারের আবগারি দফতরেরও বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হবে।
আরও পড়ুন: গণেশ পুজোর উদ্বোধনে সনাতনী ঐতিহ্যের গুরুত্ব বোঝালেন মুখ্যমন্ত্রী, একযোগে নিশানা বাম-তৃণমূলকে!
হাইকোর্টের এই কড়া মনোভাব এবং আইনি হুঁশিয়ারির মুখে পড়ে শেষমেশ পিছু হঠতে বাধ্য হয় পুনে জেলা প্রশাসন। দুপুরের বিরতির পর আদালতের নির্দেশে পূর্বের সেই দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এবার শুধুমাত্র গণেশ উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টে পর্যন্ত এবং প্রতিমা বিসর্জনের দিন অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর সম্পূর্ণ ‘ড্রাই ডে’ (Dry Day) বা মদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
হাইকোর্টের এই সময়োপযোগী রায়ের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন পুনের হোটেল ব্যবসায়ী ও সুরাপ্রেমীরা। আদালত যেভাবে উৎসবের নামে অযৌক্তিক প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করল, তা আগামী দিনে এক বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
















